অবিভক্ত বাংলার জাতীয় নেতা শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক

a.k.fojlulইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম।। শের-ই-বাংলাএকেফজলুল হক এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন। দেশএবং জাতির কল্যাণে অবদানের জন্য ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

এদেশের কৃষক শ্রমিক তথা মেহনতি মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তার অবদান জাতিগভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। এ কে ফজলুল হকের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।স্বাধীনতার চেতনা ও গণতান্ত্রিকতাবোধ সৃষ্টিতে তার অসামান্য অবদানের কথাএদেশের মানুষের মন থেকে কোনদিনই বিস্মৃত হবে না।

বাংলারধূলোমাটি ছিল যাঁর গৌরব, বাংলার মানুষের জন্যে অসীম ভালবাসা ছিল যাঁরপ্রাণের সৌরভ, বাংলার মানুষের সেবার জন্যে আজীবন সংগ্রাম ছিল যাঁর জীবনেরলক্ষ্য, নীতির প্রশ্নে যিনি ছিলেন আপোষহীন, তিনি হচ্ছেন আমাদের শের-এ-বাংলাএ. কে. ফজলুল হক। বাঙালী জাতির গর্বের উৎস এবং কেন্দ্র আমাদেরশের-এ-বাংলা। যুগযুগ ধরে ত্যাগ তিতিক্ষার দ্বারা বাঙালিদের জীবনেরসর্বক্ষেত্রে সর্বস্তরে জ্ঞান ও কর্ম সাধনার যে আদর্শ তিনি স্থাপন করেগেছেন, তা চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক বাংলার বাঘ ছিলেন।শেরেবাংলাএ কে ফজলুল হকের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা আগামীপ্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। দেশের কৃষক শ্রমিক তথা মেহনতি মানুষেরআর্থসামাজিক উন্নয়নে এ কে ফজলুল হকের অবদান জাতি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণকরে।ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার জন্য তিনি ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। তার আদর্শ যদি আমরা অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করতে পারতাম তাহলে জাতি হিসেবে আজ অনেক দূর এগুতে পারতাম।

বাঙ্গালিমুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে শেরে বাংলা জাতির কাছেচিরস্মরণীয়। জাতি হিসেবে আমরা যে সবাই বাঙালি এই ঐতিহাসিক সত্যের মূলভিত্তি তিনিই রচনা করেছিলেন।

শেরেবাংলা আমৃত্যু ছিলেন শোষিত ও বঞ্চিত জনগণের অতি আপনজন। একমাত্রপ্রেসিডেন্টের পদটি ছাড়া সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণপদ ছিল না, যা তিনি কোনো এক সময় অলঙ্কৃত করেননি।

এ অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, রাজনীতি, সমাজ সংস্কার ইত্যাদি ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন শেরে বাংলা।

অবিভক্তবাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ফজলুল হক এ অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, রাজনীতি, সমাজ সংস্কার ইত্যাদি ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। ণসালিশী বোর্ড গঠনের মাধ্যমে এদেশের কৃষককুলকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকেউদ্ধার করতে সামর্থ্য হয়েছিলেন। প্রজাস্বত্ব¡ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তিনিভূমির ওপর এদেশের কৃষক সমাজের অধিকার আদায়ে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন।

বাংলারকৃষক ও মেহনতি জনতার অকৃত্রিম বন্ধু শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুর হকেরনেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ফলেই দেশে প্রজাস্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। বাঙালিকৃষক সমাজ সামন্তবাদের শোষণ থেকে মুক্ত হয়।

বাংলার গরীব-দুঃখী মানুষের জন্য এ কে ফজলুল হকের অসীম মমত্ববোধ এ দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।

তাঁরউদ্যোগে বঙ্গীয় চাকরি নিয়োগবিধি, প্রজাস্বত্ব আইন, মহাজনী আইন, দোকানকর্মচারী আইন পাশ হয়। ফলে এ অঞ্চলের অবহেলিত কৃষক-শ্রমিক উপকৃত হন।

তিনিবহুগুণের অধিকারী ছিলেন, বাংলার মানুষের কাছে তিনি শের-ই বাংলা হিসেবেইবেশি পরিচিত ছিলেন।  জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বরিশালেররাজাপুর থানার সাতুরিয়া গ্রামে।

বিপুলঐশ্বর্যশালী পিতার একমাত্র সন্তান হলেও ফজলুল হক বাল্যকাল থেকেই বহুসদগুণের অধিকারী ছিলেন। তেমনি শৃঙ্খলা ও আদর্শের প্রতি অনুরক্ত করেই গড়েতোলা হয়েছিল তাঁকে।শের-এ-বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের বাল্যকাল থেকেইতেজস্বিতা, তীক্ষ্ণ মেধা ও প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। ঘরেই তাঁর আরবী, ফারসি ও উর্দু শিক্ষা শুরু হয়। ১৪ বছর বয়সে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে প্রথমশ্রেণীর বৃত্তি এবং পরিতোষিকসহ ঢাকা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে ১৮৮৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন। ১৮৯১কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পাস করেন। ১৮৯৩ সালে তিনি গণিত, রসায়নও পদার্থ বিদ্যায় প্রথম শ্রেণীতে বি.এ.পাস করেন। এবং ইংরেজি বিভাগে এম.এক্লাশে ভর্তি হন। ১৮৯৭ সালে তিনি লর্ড রিপন কলেজে ভর্তি  হয়ে বি.এল. পাসকরেন। আশুতোষ মুখার্জির হাত ধরে শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে তিনি কলকাতাহাইকোর্টে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯০০ সালে তিনি ওকালতিতে যোগদান করেন এবং১৯০১ সালে তিনি বরিশালে ফিরে আসেন। ১৯০৩-১৯০৪ সাল পর্যন্ত তিনি বরিশালবারের সহকারী সম্পাদক হিসেবে জয় লাভ করেন।

১৯০৬সালে তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্টেটের চাকরি গ্রহণ করেন। কিন্তু তেজস্বী হকসাহেব সরকারের সাথে মতবিরোধ হওয়ায় ১৯১১ সালে চাকরি ছেড়ে আবার আইন ব্যবসায়েনেমে পড়েন এবং একই সময়ে নবাব স্যারসলিমুল্লাহর সঙ্গে মুসলিম লীগ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯১২ সালেতিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন। ১৯২৪ সালে অবিভক্ত বাংলা শিক্ষা ওস্বাস্থ্যমন্ত্রী হন।

১৯০৬সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত নিখিন ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে তিনি অংশ নেন।১৯১৩ সাল থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য ছিলেন।১৯২০ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত মন্টেগু-চেমসফোর্ট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে কাজকরেন। ১৯১৬ সালে লক্ষ্ণৌ শহরে লীগ কংগ্রেসের যুক্ত অধিবেশনে তিনি যেপ্রস্তাব উত্থাপন করেন, তাই বিখ্যাত ‘লক্ষ্ণৌ চুক্তি’ নামে অভিহিত হয়। ১৯১৮সালে ফজলুল হক লিখিত ভারত মুসলিম লীগের দিল্লী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।সেখানে সভাপতি হিসেবে তাঁর দেওয়া ভাষণ ইতিহাসের এক স্বর্ণ অধ্যায় হয়েরয়েছে।

১৯১৮সালে শেরে বাংলা যখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক, তখন ভারতেরমহান নেতা মতিলাল নেহরু ছিলেন কংগ্রেসের যুগ্ম সম্পাদক। শেরে বাংলা ফজলুলহকই প্রথম বাঙালি হিসেবে অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিশালরাজনৈতিক গৌরব অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি ও নিখিল ভারত জাতীয় কংগ্রেসে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

শেরে বাংলা একে ফজলুল হক নবাব আব্দুল লতিফ সি আই ই-এর পৌত্রী খুরশিদ তালাত বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

কর্মজীবনবঙ্গীয় আইন পরিষদ ১৯১৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এ. কে. ফজলুক হক বঙ্গীয়আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৫ সালে পুনরায় ঢাকা বিভাগ থেকেবঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ১৯০৫ সালেবঙ্গভঙ্গ নিয়ে বাংলার জনগণ বিভক্ত হয়ে পড়লে, নবাব স্যার সলিমুল্লাহউপলব্ধি করেন মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি সংগঠন দরকার। এই চিন্তাথেকেই ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিমএডুকেশন কনফারেন্স আহবান করেন। এই কনফারেন্সে নবাব সলিমুল্লাহ নিখিল ভারতমুসলিম লীগ নামে রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন ও সেই প্রস্তাবসর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। অবশেষে ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের সূত্রপাত ঘটে।নিখিল ভারত কংগ্রেস ১৯১৪ সালে ফজলুল হক নিখিল ভারত কংগ্রেসে যোগ দেন। একইসঙ্গে তিনি মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস দলের নেতা হয়ে উঠেন। ১৯১৮ তিনি ভারতীয়জাতীয় কংগ্রেসের সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন। খেলাফত আন্দোলন এ. কে.ফজলুক হক খেলাফত আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর খেলাফতআন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এ. কে. ফজলুক হক নিখিল ভারত খেলাফত কমিটির সম্পাদকহিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলার শিক্ষামন্ত্রী এ. কে. ফজলুক হক ১৯২২সালে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে এ. কে. ফজলুক হকখুলনা উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা করেন এবং নির্বাচিত হন। ১৯২৪ সালেখুলনা অঞ্চল থকে তিনি পুনরায় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং এ সময়বাংলার গভর্ণর ছিলেন লিটন ফজলুল হককে বাংলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীনিয়োগ করেন। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচন ১৯৩৫ সালে এ.কে. ফজলুক হক কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। তিনিইকলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের প্রথম মুসলিম মেয়র।

কৃষকরাজনীতি ১৯২৪ সালে শিক্ষামন্ত্রীর পদে ইস্তফা দেয়ার পর থেকে আবুল কাশেমফজলুল হক সম্পূর্ণরূপে জড়িয়ে পড়েছিলেন কৃষকদের রাজনীতি নিয়ে। ১৯২৯ সালেনিখিল বঙ্গ প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতায়। ঢাকায় প্রজা সম্মেলনঅনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৪ সালে। এই সম্মেলনে এ. কে. ফজলুক হক সর্বসম্মতিক্রমেনিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। এই প্রজা সমিতির মধ্য দিয়েইপরবর্তিতে কৃষক-প্রজা পার্টির সূত্রপাত ঘটে। ফজলুলহক কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন করেছিলেন। তিনি কৃষক প্রজা পার্টিগঠন করে কৃষকদের অধিকার আদায়ে ছিলেন সোচ্চার।  তিনি বলেন, ফজলুল হক ১৯৩৭সালে ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে কৃষকপ্রজা পার্টি থেকে নির্বাচিত হন।

১৯৩৭সালের নির্বাচন ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টি ৩৯টি আসন ও মুসলীমলীগ ৩৮ টি আসন লাভ করে। নির্বাচনে মুসলিম লীগের সথে সমঝোতায় গিয়ে এ. কে.ফজলুক হক ১১ সদস্য বিশিষ্ট যুক্ত মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। বাংলারপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেরে বাংলা।

১৯৩৭সালের নির্বাচনে সকল নির্বাচনী দল তাদের ইশতিহারে বাংলাকে কচুরিপানারঅভিশাপ-মুক্ত করার অঙ্গীকার করেছিলেন। শের-ই-বাংলা একে ফজলুল হক নির্বাচনেবিজয় লাভ করে কচুরিপানার বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিলেন। পঁচানো কচুরিপানাউৎকৃষ্ট সার। কৃষকরা এই সার জমিতে ব্যবহার করা শুরু করলেন। অপরদিকে ভূমিহীনকৃষকরা কচুরিপানা জমিয়ে ভাসমান কৃষিজমি তৈরি করা শুরু করে দিলেন। ব্যস !১৯৪৭ সালে এসে দেখা গেল বাংলার জলাশয়গুলো কচুরিপানার বদ্ধতা থেকে মুক্ত!!সেবার বাংলাকে কচুরিপানার অভিশাপ থেকে প্রায় মুক্ত করার এই সাফল্যের পিছনেরপ্রধান কারণ ছিল বাংলার দামাল ছেলেদের অবিশ্বাস্য কর্মতৎপরতা।

১৯৪০সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিমলীগের অধিবেশনে জ্বালাময়ী বক্তৃতায় প্রথম পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন। এই লাহোর প্রস্তাবই “পাকিস্তান প্রস্তাব” হিসেবে পরবর্তীকালে আখ্যায়িত হয়।তাঁর বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে পাঞ্জাববাসীরা তাঁকে উপাধি দেয় শের-ই-বঙ্গাল অর্থাৎ বাংলার বাঘ। সে থেকে তিনি শের-ই-বাংলা নামেই পরিচিত।

১৯৩৭ সালে শের-এ-বাংলা এ. কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৩৭থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘকালের প্রধানমন্ত্রীত্বকালে তিনি বহুজনকল্যাণমূলক কাজ করেন। এ সময়ে তিনি ‘ঋণ সালিশী বোর্ড’ গঠন করেন। এর ফলেদরিদ্র চাষীরা সুদখোর মহাজনের কবল থেকে রক্ষা পায়।পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরতিনি ১৯৫২ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের এডভোকেট জেনারেল নিযুক্ত হন। ১৯৫৪সালে দেশের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ‘যুক্তফ্রন্ট’ দলের নেতৃত্ব দিয়ে বিপুলভোটাধিক্যে জয়লাভ করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। এরপররাজনৈতিক পট পরিবর্তনে তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীনিযুক্ত হন। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচকডক্টর-অব-ল এবং ১৯৫৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তাঁকে ‘হিলাল-ই-পাকিস্তান’ উপাধিতে ভূষিত করেন।শের-এ-বাংলা এ. কে. ফজলুল হকএদেশের সাধারণ মানুষের জন্যে যা করেছেন, অন্য কোন জনদরদী নেতার পক্ষে এযাবৎ তা সম্ভব হয়নি। এদেশের মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার ব্যাপক প্রসারেরজন্যে তিনিই সর্বপ্রথম অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। ঘরে ঘরে শিক্ষার আলোছড়িয়ে দেওয়ার সাধনা ছিল তাঁর আজীবনের। তাঁরই প্রচেষ্টায় ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ, লেডী ব্রাবোর্ণ কলেজ, তাঁর স্বগ্রামচাখারে ফজলুল হক কলেজ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগড়ে উঠেছে। কৃষকপ্রজা আন্দোলন, বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ও ঋণ সালিশী বোর্ডপ্রবর্তনের জন্যে তিনি বাংলার দারিদ্র্য-নিপীড়িত কৃষক সমাজের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।ব্যক্তিগত দানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন হাতেম তাই। তাঁরগোপন দানে কত দুঃস্থ কন্যাদায় গ্রস্ত পিতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে, কতছাত্র পরীক্ষার ফি দিয়ে নিশ্চিন্তে পরীক্ষা দিয়েছে, তাঁর দানে যে কতসেবাশ্রমের প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কত পীড়িতের দুঃখমোচন হয়েছে তার হিসেব নেই।তাঁর জীবনে আরও যে কত সৎগুণের সমাবেশ ঘটেছিল, ইতিহাসও তার সব খবর রাখেনি।

মুসলিমলীগে যোগদান ১৯৪৬ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচনে বরিশালঅঞ্চল ও খুলনার বাগেরহাট অঞ্চল থেকে প্রার্থী হয়ে তিনি নির্বাচিত হন।কিন্তু, দলীয় ভাবে পরাজিত হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভা গঠনকরেন ও বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই নির্বাচনেরপর দলীয় নেতাকর্মীদের চাপে হক সাহেব মুসলিম লীগে যোগ দেন। কিন্তু দলেরসদস্য হিসেবে তিনি ছিলেন নীরব। কৃষক শ্রমিক পার্টি গঠন ১৯৫৩ সালেরপ্রাদেশিক নির্বাচনের সময় তার বাসভবনে কৃষক-প্রজা পার্টির কর্মীদেরসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে দলের নাম থেকে প্রজা শব্দটি বাদ দিয়ে ‘কৃষক শ্রমিক পার্টি’ গঠন করা হয়। আবদুল লতিফ বিশ্বাসকে সাধারণ সম্পাদককরে এই পার্টির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এ. কে. ফজলুক হক। যুক্তফ্রন্টগঠন ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর এ. কে. ফজলুক হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ওমাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে নিয়ে গঠিত হল যুক্তফ্রন্ট। এই নির্বাচনে৩০০ আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ ৯ টি আসন লাভ করে। ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল এ. কে.ফজলুক হক চার সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিপরিষদগঠন করা হয় ১৫ মে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেরে বাংলা।পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এ. কে. ফজলুক হক যুক্তফ্রন্টের ২১ দফাকর্মসূচি ছিল। যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিপরিষদ এই ২১ দফা বাস্তবায়নের জন্য তৎপরহন। তাদের গৃহিত উল্লেখ্যযোগ্য কর্মসূচিগুলো হলো: ১. বাংলাকে পাকিস্তানেরঅন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ। ২. ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবেসরকারী ছুটির দিন ঘোষণা। ৩. ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতিতে ‘শহীদ মিনার’ নির্মাণ। ৪. বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিনঘোষণা। ৫. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বর্ধমান হাউসকে বাংলা ভাষা গবেষণাকেন্দ্র বা বাংলা একাডেমি ঘোষণা করা। ৬. জমিদারি ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবেউচ্ছেদের ব্যবস্থা নেওয়া। ১৯৫৫-এর নির্বাচন ১৯৫৫ এর ৫ জুন সংখ্যাসাম্যেরভিত্তিতে পুনরায় গণপরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং কোয়ালিশন সরকারগঠিত হয়। মুসলিম লীগের চৌধুরী মোহাম্মদ আলী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদ গঠনকরেন। এ. কে. ফজলুক হক ছিলেন এই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। হোসেনসোহরাওয়ার্দী ছিলেন বিরোধী দলের নেতা। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর ১৯৫৬সালের ২৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৮সালের ১ এপ্রিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার তাকে গভর্ণরের পদ থেকে অপসারণকরে। এরপরই তিনি তার ৪৬ বছরের বৈচিত্রময় রাজনৈতিক জীবন থেকে স্বেচ্ছায়অবসর গ্রহণ করেন।

শের-এ-বাংলা এ, কে, ফজলুল হক তার ভক্তবৃন্দের কাছে একটি গল্প বললেন। শের-এ-বাংলার গল্পটি শুনুন।

“একগ্রামে এক দরবেশ এলেন। দরবেশের গায়ে সবুজ রঙের এক চাদর ছিলো।দরবেশেরকাছে কেউ এলে আরোগ্য কিংবা সমস্যার সমাধান হয়েই যায়। তিনি কারো কাছ থেকেকোনো হাদিয়া নেন না। এই দরবেশের সাফল্যে গ্রামের আগের মোল্লা ও ভন্ডফকিরগণ ঈর্ষায় জ্বলতে থাকলো কারণ তাদের কাছে এখন আর কেউ আসে না। দিন দিনদরবেশের কেরামতী বাড়তে থাকলো। দরবেশ ভুলেও কখনও তার গায়ের চাদরটি ছাড়াচলেন না। মোল্লা ও ভন্ড ফকিরগণ ভাবলেন দরবেশের কেরামতি তার চাদরের মধ্যে।তাই তারা তার ঐ সবুজ রঙের চাদরটির দিকে লোভ দিলো। তারা দরবেশের কাছেঅনুরোধের সুরে চাদরটি চাইলেন। দরবেশ না করলেন। তাতে ভন্ডদের চাদরের জন্যআরও আগ্রহী হয়ে উঠলেন। তারা কেরামতী করার আশায় একদিন দরবেশের চাদরটি চুরিকরলেন। দরবেশ ঐ গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেন। ভন্ডরা ঐ চাদরের দোহাই দিয়েপুর্ণউদ্দ্যমে কাজ করে গেলেন। কিন্তু রোগী ভাল হওয়া তো দুরের কথা আরওখারাপ হতে লাগলো। আসলে কেরামতী ঐ চাদরে ছিলো না ছিলো দরবেশের মধ্যে ”

শের-এ-বাংলাএই গল্পটি বলেছিলেন তাকে যখন মুসলিম লিগ থেকে বেড় করে দেয়া হয় তখন।কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ তখন মুসলিম লিগের বড় নেতা ছিলেন। আরপাকিস্তানের জাতীর পিতার করা দল মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিলো এই বাংলায়, ঢাকার নবাব বাড়ীতে।এই গল্পটি বর্তমান সময়ও প্রসঙ্গিক।

মৃত্যু১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১০ টা ২০ মিনিটে এ. কে. ফজলুক হক ৮৬বছর ৬ মাস বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ২৮ এপ্রিল সকাল সাড়ে দশটা পর্যন্ত তারমরদেহ ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় তার ২৭ কে. এম. দাস লেনের বাসায় রাখা হয়।সেদিন সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকার পল্টন ময়দানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাকে সমাহিত করা হয়। একই স্থানে হোসেনশহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিনের কবর রয়েছে। তাদের তিনজনেরসমাধিস্থলই ঐতিহাসিক তিন নেতার মাজার নামে পরিচিত। রেডিওপাকিস্তান সেদিন সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে সারাদিন কোরআন পাঠ করে। জাতীয়পতাকা অর্ধনমিত রেখে তার প্রতি সম্মান দেখানো হয়। ৩০ এপ্রিল সোমবারপাকিস্তানের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্কুল কলেজে ছুটি ঘোষণা করা হয়।

আমাদেরজাতীয় ইতিহাসে ফজলুল হক ছিলেন এক অনন্য প্রতিভার অধিকারী। স্বাধীনতারচেতনা ও গণতান্ত্রিকবোধ সৃষ্টিতে তার অসামান্য অবদানের কথা এদেশের মানুষেরমন থেকে কোনোদিনই বিস্মৃত হবে না।শের-ই-বাংলাএ কে এম ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার জন্যসংগ্রাম করেছিলেন। তিনি ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাবাদের অগ্রনায়ক। আবারঅন্যদিকে ছিলেন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক বাহক। শের-ই-বাংলারনামে স্মারক গ্রন্থ প্রকাশে করে তিনি কি করেছিলেন তা বর্তমান প্রজন্মেরজানা প্রয়োজন আছে। তার জীবনের স্মরণীয় দিকগুলো তুলে নিয়ে আসতে হবে।

এইধরনের অবিসংবাদিত নেতা একটি জাতির ইতিহাসে খুব অল্পই জন্মে।আমরা অতীবভাগ্যবান যে আমরা একই সময়ে এই ধরনের বেশ কয়েকজননেতাকে(সোহরাওয়ার্দী,মওলানা ভাসানী) সাথে পেয়েছিলাম যেকারণে বৃটিশশাসকদের থেকে মুক্ত হতে না হতেই আমরা অতি দ্রুত একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি।

শেরে বাংলা স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখতেন। আসুন এই মহান নেতার জন্মদিনে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিবেদিত হবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই।

লেখক : জিয়া পরিষদের সহ আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক  সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের যুক্তরাজ্য শাখার যুগ্ম আহবায়ক ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম