বঙ্গবন্ধুর ভাষন শুনে যুদ্ধে অংশ নেন নাটোরের মুক্তিযোদ্ধা নবীউর রহমান পিপলু

Natore Muktijoddha Piplu-16-03-15নাটোর ॥ বীর মুক্তিযোদ্ধা নবীউর রহমান পিপলু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষন শুনে এবং পরিবারের সকলের উৎসাহে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। চোখের সামনে পাকসেনা ও রাজাকাররা নির্বিচারে মানুষ হত্যা,নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে লুটপাট করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা তার হৃদয়কে ব্যাথিত করে। অবশেষে মা-বাবা ও পরিবারের লোকজনের দোয়া নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি যুদ্ধের মাঠেই ছিলেন। সোমবার এক সাক্ষাতকারে সে সময়ের স্মৃতিগুলো তিনি এভাবেই বর্ননা করেন।

নবীউর রহমান পিপলু তখন তৎকালিন জিন্নাহ মডেল হাইস্কুলের (বর্তমান সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়) মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। তখন তার কি বা এমন বয়স হয়েছে। দুরন্তপনার কারনে রাজনৈতিক দলের মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতেন তিনি। ঢাকার রেস কোর্স ময়দানে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনের পর সারা দেশ তখন উত্তাল। সেসময় সারাদেশ অসহযোগ আন্দোলনে উত্তাল। সেই আন্দোলনে তিনিও তখন যোগ দেন। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষন শুনে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে মা-বাবাসহ পরিবারের সকলের উৎসাহে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন। ২৫ মার্চ কালোরাতের পর যখন যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে পাক সেনাদের প্রতিরোধ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে তখন নাটোরের মুক্তিযোদ্ধাদেরও সে প্রস্তুতিতে ব্যাত্যয় ঘটেনি। তিনিসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, আদিবাসী জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পাকসেনাদের প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেয়। ২৭ মার্চ তৎকালীন নাটোর টাউন পার্কে সর্বস্তরের এক সমাবেশ থেকে গঠন করা হয় সংগ্রাম কমিটি। চলতে থাকে জঙ্গী মিছিল ও মিটিং। আওয়ামী লীগ নেতা শংকর গোবিন্দ চৌধুরী, আনিসুল ইসলাম, রমজান আলী, সৈয়দ মোতাহার আলী, খন্দকার আবু আলী, মজিবর রহমান রেজা, মজিবর রহমান সেন্টু, কামরুল ইসলাম,অনাদি কুমার বসাক ,শেখ আলাউদ্দিন প্রমুখ এ সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। ইতিমধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা নাটোরের ট্রেজারীর অস্ত্রাগার ভেঙ্গে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। এরই অংশ হিসেবে সিরাজ উদ দৌলা কলেজের তৎকালীন ছাত্রাবাস এবং বর্তমানের রাণী ভবানী মহিলা কলেজ চত্বরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। ২৯ শে মার্চ পাক বাহিনীর একটি দল ঢাকা সেনানিবাস থেকে নগরবাড়ী ঘাট পার হয়ে ঈশ্বরদী ঘুরে নাটোরে আসছে এ সংবাদ শুনে নাটোরের বিভিন্ন স্থানে বেরিকেড দিয়ে প্রতিরোধ করতে ঝাপিয়ে পড়ে তিনিসহ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। পাকসেনারা ঈশ্বরদী থেকে লালপুর হয়ে রাজশাহী যাওয়ার পথে গোপালপুর রেলস্টেশনে বাধাপ্রাপ্ত হয়। এরপর তারা লালপুর উপজেলার ময়না গ্রামের দিকে এগুতে থাকে। সেখানে বিশাল জনতা তাদের প্রতিরোধ করলে পাক সেনারা ময়না গ্রামেই আশ্রয় নেয়। খবর পেয়ে ঈশ্বরদী থেকে ইপিআর বাহিনী এবং নাটোর থেকে পুলিশ ও আনসার সদস্য সহ শত শত মুক্তিকামী মানুষ বন্দুক, রাইফেল সহ দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ময়না গ্রামে পাক সেনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় অসম যুদ্ধ। যা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম যুদ্ধ। ৩০ মার্চ যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে পিছু হটে পাকসেনারা । এই যুদ্ধে ৭ পাকসেনা নিহত হয় এবং বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১২ এপ্রিলের পর নাটোরে পাকসেনাদের প্রতিরোধ করা সম্ভব না হওয়ায় অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে তিনি ভারতে যান। সেখানে প্রথমে পশ্চিম দিনাজপুর জেলার বালুরঘাটের কামারপাড়া কুড়মাইলে পাবনার বেড়া এলাকার তৎকালীন এমসিএ অধ্যাপক আবু সাঈদ পরিচালিত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যোগ দিয়ে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন। এই ক্যাম্পে অনেকের মধ্যে তার সঙ্গে সঙ্গী হন বগুড়া নট্রামসের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল মান্নান। এই ক্যাম্পে মাঝে মাঝে হাজির হয়ে প্রশিক্ষনরত মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা যোগাতেন বাংলাদেশ চলচিত্রের শক্তিমান অভিনেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হাসান ইমাম, প্রয়াত আনোয়ার হোসেন, চিত্র নায়ক জাফর ইকবাল এবং চিত্র নায়িকা ও নারায়ণগঞ্জের সাবেক এমপি সারাহ কবীর (কবরী) প্রমুখ। এখান থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষনের জন্য প্রথমে ভারতের রায়গঞ্জ সেনা ক্যাম্প এবং পরবর্তীতে দার্জিলিং জেলার শিলিগুলির পানিঘাটা (বাগডোকরা) ক্যাম্পে প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন। এসব ক্যাম্পে গেরিলা, এ্যাডভান্স ও জেএলসি (জুনিয়র লিডার কোর্স) প্রশিক্ষনও গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষন শেষে রায়গঞ্জের পতিরামপুর (গঙ্গারামপুর)এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আসেন। বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী এএইচ এম কামরুজ্জামান এই ক্যাম্প পরিদর্শনে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করেন। মুক্তিযুদ্ধের ৭নং সেক্টরের অধীন গঠিত তুফানি ব্যাটেলিয়ানের( ব্রেভো সেক্টর) সদস্য হিসেবে বালুরঘাটের সীমান্ত এলাকা অযোধ্যায় মাটির নীচে বাংকার করে ওই ক্যাম্পে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। এই ক্যাম্প থেকে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে প্রতিদিন বাংলাদেশের নওগাঁ, জয়পুরহাট, পাঁচবিবি ও হিলি এলাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। ৭১-এর ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে ভারতীয় বাহিনী মিত্র বাহিনী হিসেরে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়। তুফানি ব্যাটেলিয়নের কোম্পানী কমান্ডার ভারতীয় সেনা সদস্য মেজর মতিলাল চৌধুরীর কমান্ডে মিত্র বাহিনীর সঙ্গে আমার সেকসন কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা বগুড়ার এরুলিয়া গ্রামের জাকারিয়া তালুকদারের নেতৃত্বে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন।

যুদ্ধের একদিনের কথা এখনও তার মনে পড়ে। অযোধ্যা ক্যাম্প থেকে রাত্রিতে ভারতীয় সেনা সদস্য সুবেদার দেলবর সিংয়ের নেতৃত্বে তিনিসহ ২০/২৫ জনের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল নওগাঁ সীমান্তের ফার্সিপাড়া-নওগাঁ রাস্তার ব্রীজ ধ্বংস করা সহ গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিতে রওনা হয়। তীব্র শীতের রাতে রওনা হওয়ার পর পথে একটি নদী পড়ায় থামতে হয় সবাইকে। বিবস্ত্র হয়ে তারা নদী পার হতে বাধ্য হন। কেননা নিদের্শটি ছিল কমান্ডারের। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। নদীটি পার হয়ে ফার্সিপাড়া রাস্তার ব্রীজের কাছাকাছি যেতেই আচমকা পাকসেনাদের আক্রমনের মুখে পড়লে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। যুদ্ধকালীন বিশেষ সাংকেতিক শব্দে একত্রিত হলেও কমান্ডারের নির্দেশ পাওয়া যাচ্ছিলনা। বিক্ষিপ্তভাবে গোলাগুলির এক পর্যায়ে নিজেদের বুদ্ধিতে পাকসেনাদের আনুমানিক অবস্থান লক্ষ্য করে তাদের কাছে থাকা ৬ ইঞ্চি মটার সেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। একপর্যায়ে পাকসেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং দুটি জিপ গাড়ী ফেলে যায়। পরে ওই গাড়ী দু’টিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ক্যাম্পে ফিরে যান। প্রতিকুল অবস্থার পরেও এই যুদ্ধে তাদের কোন যোদ্ধা হতাহত হয়নি। এরপর একদিন হিলি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করলে পাকসেনাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়েন। সেখান থেকে পিছু হটে পাঁচবিবি সীমান্ত দিয়ে দেশের ভিতরে প্রবেশ করে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। ১২ ডিসেম্বর রংপুরের গোবিন্দগঞ্জ মুক্ত হলে তারা বগুড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে বিভিন্ন স্থানে ছোট খাটো যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মিত্র ও মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে ১৩ ডিসেম্বর বগুড়া শত্র“মুক্ত হয়। এসব যুদ্ধে মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর বেশ কিছু সদস্য শহীদ হন। পাকসেনাও নিহত হয় অনেক। পরে বগুড়ার পুলিশ লাইনে তারা ক্যাম্প স্থাপন করেন। ১৬ ডিসে¤র^ ঢাকা সহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় পাকবাহিনী আত্মসমর্পন করলে ১৮ ডিসেম্বর নাটোরে ফিরে আসেন। কিন্তু তখনও নাটোর শত্র“ মুক্ত হয়নি। ২১ ডিসেম্বর নাটোর শত্র“মুক্ত হয়।

মুক্তিযোদ্ধা নবীউর রহমান পিপলু ১৯৫৬ সালে নাটোর শহরের আলাইপুর মহল্লার এক সম্ভ্রান্ত পনিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম রশীদুর রহমান ও মাতা নুরুন নেসা বেগম। তারা ৫ ভাই ও ৬ বোন। তিনি ছিলেন রশীদুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তার বাবা যুদ্ধ পুর্ববর্তী সময়ে নাটোর সদর হাসপাতালে নার্সিং এটেনন্ডেন্ট(সেবক) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি ভারতের জলংগী হাসপাতালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নবীউর রহমান পিপলু জানান, দেশ স্বাধীনের ৪২ বছরেও তিনি বা তার পরিবার সরকারী কোন পৃষ্ঠপোষকতা পাননি। এমনকি নাটোরের গণকবরগুলোও সরকারী স্বীকৃতি পায়নি। বরং অমুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মর্যাদা পাচ্ছে। এজন্য তিনি ক্ষোভে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। তবে তিনি তার মৃত্যুর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি দেখে যেতে চান। একই সঙ্গে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের খুজে বের করে সঠিক মুল্যায়ন করবেন এ আশাবাদ তিনি ব্যক্ত করেন। বর্তমানে তিনি একুশে টেলিভিশন ও দৈনিক সমকালে কর্মরত আছেন।

-অননিউজ/সম্পাদনা/এস,বি/১৬ মার্চ ১৫