৭১’র ৩১মার্চ দেবীদ্বার ‘ভিংলাবাড়ি- জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ যুদ্ধ’ গৌরবোজ্জ্বল যুদ্ধ এবং যোদ্ধার স্বীকৃতির দাবী

DEBIDWAR PIC; - 31 MARCH JODHO- 30.03.15.এবিএম আতিকুর রহমান বাশার,দেবীদ্বার(কুমিল্লা)।।১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষনার মাত্র ৫দিনের মধ্যে অর্থাৎ ৩১ মার্চ দিনব্যপী অত্যাধুনিক অস্ত্রে সু-সজ্জিত ১৫ সদস্যের একটি পাক শত্রুসেনা দল’র সাথে সম্মুখসমরে ৩৩ বাঙ্গালী শহীদ এবং অসংখ্য যোদ্ধা পঙ্গুত্ব হওয়ার মধ্যদিয়ে পুরো দলটিকে পরাস্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরব অর্জন করেছিল স্থানীয় বীর বাঙ্গালীরা। স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও ওই যুদ্ধ এবং যুদ্ধে শহীদদের স্বীকৃতি কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভূক্ত করা হয়নি। দিবসটি উদযাপনে আজ সকাল ১০ টায় দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন দেবীদ্বার শাখা। শহীদ পরিবারগুলোও নিজ উদ্যোগে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে।

         অপর দিকে শত্রুসেনাদের সাথে সম্মূখসমরে নিরস্ত্র বাঙ্গালীরা অত্যাধুনিক অস্ত্রে সু-সজ্জিত ১৫ সদস্যের একটি পাক শত্রুসেনাকে পরাস্ত করে এবং ৩৩ বাঙ্গালীর আত্মহুতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরবোজ্জ্বল দেবীদ্বার’র “ভিংলাবাড়ি-জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ যুদ্ধের” স্বীকৃতি এবং শহীদ ও যুদ্ধাহতদের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ভূক্ত করার দাবীতে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ে আবেদন করা হয়েছে। দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারী কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারন সম্পাদক আব্দুল আউয়াল ভূঞা সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ে ওই আবেদন পত্র জমা দিয়েছেন। সোমবার বিকেলে আবেদনকারী আব্দুল আউয়াল ভূঞা সেল ফোনে জানান, রোববার ওই সংশ্লিষ্ট আবেদন পত্রটি প্রধান মন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয় এবং সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয়ে ওই আবেদন পত্র প্রেঢ়ন করেছি।

           যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়,- আমাদের আর কোন চাওয়া-পাওয়া নেই ; দাবী একটাই, “গৌরবোজ্জ্বল যুদ্ধ এবং যোদ্ধার স্বীকৃতি চাই”। ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো’ বঙ্গবন্ধুর ওই ডাকে সারা দিয়ে দেবীদ্বারের নিরস্ত্র বাঙ্গালীরা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের ঘোষনার মাত্র ৫দিনের মধ্যে অর্থাৎ ৩১ মার্চ অত্যাধুনিক অস্ত্রে সু-সজ্জিত ১৫সদস্যের একটি পাক শত্রুসেনা দল’র সাথে সম্মুখসমরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। দিনব্যপী যুদ্ধে ৩৩ বাঙ্গালীর শহীদ এবং অসংখ্য যোদ্ধা আহত হওয়ার মধ্যদিয়ে পুরো দলটিকে পরাস্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরব অর্জন করেছিলাম। বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনায় শত্রুসেনাদের সাথে সম্মূখসমরে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরবোজ্জ্বল দেবীদ্বার’র ‘ভিংলাবাড়ি-জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ যুদ্ধের’ স্বীকৃতি চাই। যারা পঙ্গুত্ব বরণ করে বেঁচে আছি,- তাদের যোদ্ধাহত মুক্তি যোদ্ধা, আর পাক শত্রুসেনাদের সাথে সম্মূখ সমরে যে ৩৩ বাঙ্গালী শহীদ হয়েছেন,- তাদের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্তি চাই। নিদারুন ক্ষোভ ও যন্ত্রনা থেকে কথাগুলো বলেছেন ওই যুদ্ধের কিংবদন্তি কুদ্দুস ড্রাইভার, যুদ্ধাহত আলফু ফকির, শহীদ আব্দুল মজিদ সরকার’র ছেলে ডা. আব্দুল কাদের সরকার।

     তারা ক্ষোভের সাথে আরো জানান, আমরা ভাতা চাইনা, সুবিধা চাইনা, সম্মানী চাইনা, আমরা সুযোগ চাইনা, আমরা আমাদের প্রাপ্য অধিকার ‘স্বীকৃতি বুঝে পেতে চাই’। স্বাধীনতার পর এ দীর্ঘসময়ে কেউ আমাদের পরিবারের খোঁজ নেয়নি। সাংবাদিকরা প্রতি বছর খোঁজ-খবর নিতে এসে কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিয়ে যন্ত্রনা বাড়িয়ে দিয়ে যান, আপনারা আমাদের জন্য কি করতে পেরেছেন ? যখন ‘মুক্তিযোদ্ধা’ নামের সংগঠনটির জন্ম হয়নি, দেশে রাজাকার, আলবদর, আলশামস্, শান্তিকমিটি, পিচকমিটি কোনটির’ই সৃষ্টি হয়নি। এমনকি প্রবাসী সরকারও গঠন করা হয়নি। তখনই আমরা, আমাদের বাবারা, আমাদের স্বজনেরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ নিশ্চিত মৃত্যুকে বরন করে শত্রু সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, শত্রুসেনাদের হত্যা করেছিলাম, আমাদের সহযোদ্ধারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন। দেশ স্বাধীনের পর আমরাই অবহেলিত, আমরা ভারতে যেয়ে প্রশিক্ষন নিয়ে যুদ্ধ করিনি সে অপরাধে সেদিনের যুদ্ধ যেমন স্বীকৃতি পায়নি, একই অপরাধে আমরাও শহীদ কিংবা যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাইনি, তাহলে বঙ্গবন্ধু সেদিন কেন স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন ? আমাদের সেদিনের ভূমিকা কি জাতির কাছে অপরাধ ছিল ? এ প্রশ্ন আজ বঙ্গবন্ধু কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাছিনার কাছে।

     তাদের এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে দেবীদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ গ্রামে ১৯৭১সালের ২৭মার্চ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী প্রশিক্ষন ক্যাম্প ‘নলআরা(গভীর জঙ্গল)’য় দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব কর্তৃক আয়োজিত ‘৭১’র চিঠিপাঠ ও মুক্তিযোদ্ধাদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’র উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ.আ.ম.স. আরেফিন সিদ্দিক’র কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ৩০লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’ পেয়েছি, ৩১ মার্চ যারা শহীদ হয়েছেন তাদের অংশিদারিত্বও এখানে আছে। তবে জনযুদ্ধ, গণযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের প্রকার ভেদে ৩১ মার্চ যুদ্ধে শহীদ ও যুদ্ধাহত মুক্তি যোদ্ধারা কোন তালিকাভূক্ত হবেন তা সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ই বলতে পারেন।

     একই প্রশ্নের জবাবে দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকা’র সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, এটার সমাধান খুঁজতে দেশের বুদ্ধিজীবী, আইন বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের মতামতের ভিত্তিতে করতে হবে। প্রয়োজনে জাতীয় সংসদের বিল উত্থাপন করতে হতে পারে। তবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কিংবা কোন উদ্যোক্তা এগিয়ে আসলে ঢাকায় একটি গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে তার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে।

       ২০১১সালে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা যাচাই বাছাইকালে সাবেক দেবীদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মামুনুর রশীদ ভূঞা আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, যেহেতু বিষয়টি স্পর্শকাতর, দীর্ঘদিন যাবত প্রশাসনের উদ্যোগে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ১৫সদস্যের একটি অত্যাধুনিক অস্ত্রে সু-সজ্জিত পাকসেনা দলকে দিনব্যাপীযুদ্ধে ৩৩বাঙ্গালীর জীবনদানে বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরব অর্জন করেছে, সেহেতু আমার পক্ষ থেকে যাচাই বাছাই ও তথ্য উপাত্ত নিয়ে সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য একটি আবেদন পত্র পাঠাবো, এখন মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই বাছাই’র কাজ চলছে। বিষয়টি ফয়সালা করার এখনই উপযুক্ত সময়। স্বাধীনতার ৪১বছরেও ওই সমস্ত আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহনের বিষয়টি ফাইল বন্দিই রয়ে গেল।

       শহীদ আব্দুল মজিদ সরকার’র ছেলে ডা. আব্দুল কাদের সরকার ক্ষোভের সাথে জানান, আমি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কটাক্ষ করে বলছিনা, শ্রদ্ধা নিয়েই বলছি, ভারতে যেয়ে প্রশিক্ষন নেয়া অনেক মুক্তিযোদ্ধা পাক সেনাদের লক্ষ করে একটি বুলেটও ছুড়ে মারার সুযোগ পাননি, অনেক মুক্তিযোদ্ধা পাক শত্রুদের চেহারাও দেখেননি তবুও আইন সিদ্ধ স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা। অথচ আমার পিতা শহীদ আব্দুল মজিদ সরকার তার সহকর্মী কৃষক সৈয়দ আলী যখন পাকসেনাদের ধাওয়া করে হালের পাজুন দিয়ে পেটাতে গিয়ে গুলি বিদ্ধ হয়ে শহীদ হন, তখন মৃত্যু নিশ্চিত জেনে তিনিও (আব্দুল মজিদ সরকার) ঝাঁটা নিয়ে পাকশত্রুসেনাদের মারতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। আমার পিতাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তালিকাভূক্ত করতে স্থানীয় দপ্তর থেকে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয় পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তালিকা ভূক্ত করতে পারিনি, আমার পিতার মত ওই যুদ্ধে শহীদ কোন মুক্তি যোদ্ধাকে তালিকায় আনা হয়নি।

     স্বাধীনতার ৪১বছরে অনেক ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা এমনকি রাজাকাররাও মুক্তিযোদ্ধা বনে গিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে আছেন, রাষ্ট্রের নানা সুবিধা ভোগ করছেন। সুবিধাভোগী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থদ্বন্দের সুযোগে যারা স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছে, স্বাধীনতাকে স্বীকার করেননি, সেই মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধীরা জাতীয় পতাকাবাহী গাড়ি চড়ে জাতীয় সংসদের চেয়ারে বসার দাম্ভিকতা দেখিয়েছে, অথচ ৩১মার্চ’র যুদ্ধে কুমিল্লাবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামে যে অবদান রেখেছেন তা সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামে পরিচালিত বড়ধরনের যে কোন অভিযানের চেয়ে কম নয়। সে যুদ্ধ স্বাধীনতার ৪১বছর পরও নুন্যতম প্রাপ্তি ‘স্বীকৃতি’ থেকে বঞ্চিত। বিষয়টি রাষ্ট্র পক্ষের ভাবা দরকার।

         কারন, ১৯৭১সালের ১৯মার্চ পাকিস্তানী বর্বর বাহিনীর বিরুদ্ধে গাজীপুরের জয়দেবপুরে সর্বপ্রথম বীর বাঙ্গালীর সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ সূচনা হয়েছিল। যে যুদ্ধটি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে অনুপ্রেরনা যুগিয়েছিল। বাঙ্গালী জাতীকে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল, শুধু তাই নয়, ওই দিনের জাগরনী শ্লোগান;- “জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর” এ শ্লোগানটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি মাইলফলক হিসাবে যেমন স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য, তেমনই স্বাধীনতা ঘোষনার মাত্র ৫দিনের মাথায় অর্থাৎ ৩১মার্চ নিরস্ত্র বাঙ্গালীরা সশস্ত্রযোদ্ধা বনে গিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সু-সজ্জিত ১৫সদস্যের একটি দলকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্থ করে বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরব অর্জন করেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এ গৌরবোজ্জ্বল বিজয় ছিনিয়ে আনতে দেবীদ্বার থানার অস্ত্রাগার লুন্ঠন এবং ‘মরিচের গুড়া’ নামে বঙ্গজ হাতিয়ারটিও ব্যবহার হয়েছিল। ওই যুদ্ধে ৩৩শহীদ পরিবার এবং শতাধিক যোদ্ধাহত বীর সৈনিককে অদ্যবধি নুন্যতম শান্ত¦নার বাণীও কেউ শোনাতে আসেনি। প্রতি বছর দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব এবং জাফরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ’র উদ্যোগে দিবসটি নিয়ে স্মৃতিচারণ করা হয়। ৪১বছর ধরে তাদের পরিবার, প্রিয়জন হারানোর শোক আর পঙ্গুত্বের অভিশপ্ত জীবন নিয়ে বেঁচে আছে। সেই শহীদদের কবরগুলোও অযতœ অবহেলায় পড়ে আছে। বর্তমান সরকার ওই যুদ্ধে শহীদ ও যুদ্ধাহত পরিবারের আর্তি শ্রবণে সঠিক সমাধানে এগিয়ে আসবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সরকার আসে সরকার যায়, প্রতিটি সরকারের কাছে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভূক্ত করণের আবেদন জানালেও এ পর্যন্ত কোন সরকারই বিষয়টি আমলে নেয়নি। ঘটনাটি ‘এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত বাংলা পিডিয়ার ষষ্ঠ খন্ডের ৪০৩ পৃষ্ঠায় দেবীদ্বার উপজেলার ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে ভিংলাবাড়ি-জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ যুদ্ধ সম্পর্কে “১৯৭১সালের ৩১মার্চ ‘কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে পাক বাহিনীর সঙ্গে বাঙ্গালীদের এক সংঘর্ষ হয়, এতে ৩৩বাঙ্গালী শহীদহন” উল্লেখ থাকলেও ঐতিহাসিক ভাবে আর কোথাও স্থান পায়নি।

       বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে সারাদেশের মুক্তিকামী জনতা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৭১’র রক্তঝরা দিনগুলোতে স্বাধীনতা ঘোষনার মাত্র ৫দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ৩১মার্চ রাজধানীসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরের বাহিরে শত্রুসেনাদের সাথে সম্মূখযুদ্ধে প্রাণ বাজি রেখে বিজয় ছিনিয়ে আনার মত গৌরব অধ্যায়ই নয়, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম থেকেই দেবীদ্বারে প্রতিরোধের দানা বাঁধতে শুরু করে।

         সেদিনের যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলা থেকে ১৫সদস্যের একদল পাক সেনা কসবা এলাকায় এক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পায়ে হেঁটে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাউনি বর্তমান কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাসে আসার পথে ১৯৭১’র ৩১মার্চ কাক ডাকা ভোর রাতে ভিংলাবাড়ি এলাকায় প্রথম অবরুদ্ধ হয়। সংবাদ পেয়ে মুহুর্তের মধ্যে ভিংলাবাড়ী, বড়আলমপুর, চাঁপানগর, দেবীদ্বার, ছোটআলমপুর, বিনাইপাড়, ফতেহাবাদ, বিজলীবাজার, মরিচাকান্দাসহ বিভিন্ন গ্রামের হাজার হাজার জনতা ‘জয়বাংলা,’ ‘ধর শালাদের’, ‘মার শালাদের’ শ্লোগানে শ্লোগানে প্রকম্পিত করে দা, ছেনি, লাঠিসহ বিভিন্ন বঙ্গজ হাতিয়ার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাক হায়ানাদের উপর। পাক হায়ানারা ধাওয়া খেয়ে চাঁপানগর গ্রামের আবুল কাসেম’র বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এসময় ওই বাড়ির এক গৃহবধূর উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালানোর সময় আবুল কাসেম এক পাকসেনাকে লক্ষ করে ইট ছুড়ে মাথা ফাটিয়ে দেয় এবং রাগে ক্ষোভে তাদের উপর ঝাঁপটে পড়লে পাকসেনার গুলিতে আবুল কাসেম শহীদ হন। এ ঘটনায় বাঙ্গালীরা আরো ক্ষেপে উঠে। বিক্ষুব্ধ জনতার সাথে রাজারবাগ পুলিশলাইন থেকে পালিয়ে আসা কয়েকজন পুলিশ সদস্য যোগ দিয়ে দেবীদ্বার থানার অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে। বঙ্গজ হাতিয়ার’র এর পাশাপাশি ওই লুন্ঠিত হাতিয়ার দিয়ে পাক হায়ানাদের সাথে বাঙ্গালীরা যুদ্ধ শুরু করেন। পাক সেনারা গুলিবর্ষণ করতে করতে ময়নামতি সেনানিবাসের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে বারেরা কোরের পাড় অবরুদ্ধ হয়। হাল-চাষরত সৈয়দ আলী সেনাদের দেখে দৌড়ে এসে হালের পাজুন দিয়ে পেটাতে থাকেন। কারন তার মেয়ে ও মেয়ের জামাই ঢাকায় নিখোঁজ এবং পাক হায়ানাদের গুলিতে ২৫মার্চ রাতে অসংখ্য লোকের হতাহতের ঘটনায় তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন। পাকসেনাদের গুলিতে সৈয়দ আলী শাহাদাত বরন করলে সহযোদ্ধার মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ অপর কৃষক আব্দুল মজিদ সরকার ঝাঁটা নিয়ে হায়ানাদের পেটাতে থাকে, এসময় হায়ানাদের গুলিতে তিনিও শাহাদাত বরন করেন। একই জায়গায় বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে দু’পাক সেনা নিহত হয়, চরবাকর এলাকায় তিনজন, বেগমাবাদ এলাকায় আরো তিনজন নিহতসহ মোট আটজনদের মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। বাকী সাত জন জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদে আশ্রয় নিয়ে ওই মসজিদটিকে বাংকার হিসাবে ব্যবহার করে। এসময় দেবীদ্বার, মুরাদনগর, চান্দিনা, হোমনা, বুড়িচং, ব্রাহ্মনপাড়া, কুমিল্লা সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা, বাঞ্ছারাম্পুর উপজেলার হাজার হাজার জনতা সন্ধ্যা নাগাদ পরিচালিত ওই যুদ্ধে অংশ নেন। পাক হায়ানাদের এলোপাথারী গুলিবর্ষনের কারনে স্থানীয় মুক্তিকামী জনতার পক্ষ থেকে মাইকিং করে জনতাকে নিরাপদ দূরত্ব থাকার আহবান জানিয়ে প্রাণভয়ে মসজিদে আশ্রয় নেয়া পাকসেনাদের হত্যার পরিকল্পনা নেয়।

           বুড়িচং উপজেলার কংশনগর গ্রামের কুদ্দুস ড্রাইভার, জাফরগঞ্জ গ্রামের শের আলী, তব্দল ড্রাইভারসহ অন্যান্যদের সহযোগীতায় ময়নামতি থেকে পেট্রোল এনে, বিভিন্ন বাড়ি থেকে লেপ, তোষক, কাঁথা, সাবল, খন্তি ও মরিচের গুড়া নিয়ে পুকুর সাতড়ে ওপারে যায় এবং কুদ্দুছ ড্রাইভার মসজিদের উপর উঠে ছাদ ফুটা করতে থাকেন, এক সময় পাক সেনারা ফুটা বরাবর গুলিবর্ষণ করলে ফুটা আরো বড় হয়ে যায়। অপর দিকে মসজিদের জানালা দিয়ে জনতার দিকে তাক করে রাখা দু’টি বন্দুক, তব্দল ড্রাইভার মসজিদের দেয়াল ঘেষে ক্রোলিং করে এসে দু’টি বন্দুক হেচ্কা টানে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় ভেতর থেকে অপর এক পাক সেনার গুলিতে তিনি ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। কুদ্দুস ড্রাইভার লেপ তোষকে পেট্রোল ঢেলে মরিচের গুড়া মিশিয়ে আগুন জ্বালিয়ে মসজিদের ছাদের ফুটা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দেয়। মসজিদে আশ্রয় নেয়া পাক সেনাদের অস্ত্র ও গুলি ফুরিয়ে যায়, তারা তাদের মৃত্যু নিশ্চিত বুঝতে পেরে সাথে থাকা টাকা, ওয়ার্লেসসহ বিভিন্ন সামগ্রী ভেঙ্গে ও ছিড়ে ফেলে দেয়। ত্যাজস্ক্রীয় গ্যাসে ক্ষুদার্ত, ক্লান্ত, অবরুদ্ধ পাক সেনারা বস্ত্র খুলে হাত উঁচু করে বেড়িয়ে এস আত্মসমর্পণ করে। কুদ্দুস ড্রাইভার মসজিদের ঘাটলায় টহলরত এক পাক সেনাকে লক্ষ করে হাতে থাকা ছেনি নিয়ে মসজিদের ছাদ থেকে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই সেনাসদস্যের ডান হাত কেটে গিয়ে বন্দুকটি পড়ে যায়, কুদ্দুস ড্রাইভার তাকে পানিতে চুবিয়ে শ্বাস রুদ্ধ করে হত্যাপূর্বক তার বন্দুকটি নিয়ে ওপাড়ে চলে যায়, সাতরে যাওয়ার সময় বন্দুকের টিগারে পায়ের আঙ্গুল লেগে একটি গুলি বের হয়ে নাক এবং মাথা ঘেঁষে গেলেও তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। বিক্ষুব্ধ জনতা আত্মসমর্পণকারী বাকী ছয়জনসহ সাতজনকেই হত্যা পূর্বক তাদের লাশ বস্তা বন্দি করে গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় পরবর্তীতে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আফসু রাজাকারের সহযোগীতায় পাক হায়ানাদের তান্ডবে এ অঞ্চলকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে।

         স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শিদের তথ্যমতে ওই যুদ্ধে ভিংলাবাড়ি থেকে জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুরপাড় জামে মসজিদ পর্যন্ত প্রায় ১৫কিলোমিটার বিস্তৃত ছিল। এই যুদ্ধে পাক সেনাদের গুলিতে প্রথম শহীদ হন চাঁপানগর গ্রামের নুরুল ইসলাম, তার পর বারেরা গ্রামের সৈয়দআলী, আব্দুল মজিদ সরকার, সরুমিয়া, চরবাকর গ্রামের মমতাজ বেগম, নায়েবআলী, সফরআলী, সাদতআলী, লালমিয়া, পৈয়াবাড়ি গ্রামের কেনু মিয়া, ঝারুমিয়া, বাজেবাকর গ্রামের আব্দুল মালেক, খলিলপুর গ্রামের আব্দুর রহিম, ফুলতলি গ্রামের ছফর আলী, কংশনগর গ্রামের তব্দল ড্রাইভার, ফরিদ মিয়াসহ ৩৩বাঙ্গালী শহীদ হন।

       স্বাধীনতা সংগ্রামে হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের তান্ডবের ছোঁয়া লাগেনি এমন গ্রাম দেবীদ্বারে নেই। অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ। তার পরেই ছিল কসবা অঞ্চল। কারন খুব কাছেই ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সেনা ছাউনি কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাস। অপর দিকে প্রায় একই ব্যবধানে ছিল ভারত সীমান্ত। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের ভারত সীমান্ত পারাপারে একমাত্র নিরাপদ এলাকা ছিল দেবীদ্বার। মুক্তিযোদ্ধাও ছিল এ অঞ্চলে অনেক বেশী। পাক হায়ানাদের নির্মম তান্ডবের স্বাক্ষর দেবীদ্বার সদরে প্রতিষ্ঠিত গণকবর, পোনরা শহীদ আবু বকরের কবর, ভূষনা গ্রামে ৬শহীদের কবর, বারুর গ্রামে ৬মুক্তিযোদ্ধার কবর, ধামতী আলীয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাওলানা আলীমুদ্দিনপীর’র দু’নাতির কবর, ভিড়াল্লা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মজিবুর রহমান খান’র কবরসহ অসংখ্য স্মৃতি। তাছাড়া পাক সেনাদের সাথে সম্মূখসমরেও পিছিয়ে ছিলনা এ অঞ্চল। বরকামতা যুদ্ধ, ভানী এলাকার যুদ্ধ, বারুর যুদ্ধ, ধামতী ও ভূষণা যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া দেবীদ্বারের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান সৃষ্টিকারী প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা মন্ডলীর একমাত্র জীবিত সদস্য ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন কর্তৃক গঠিত বিশেষ গেরিলাবাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কমরেড আব্দুল হাফেজ, যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের পালাটোনাক্যাম্প প্রধান সাবেক সাংসদ যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন সুজাত আলী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সাবেক এমএনএ আব্দুল আজিজ খান, আজগর হোসেন মাষ্টারসহ অসংখ্য যোদ্ধা।

-অননিউজ/সম্পাদনা/এস,বি/৩০ মার্চ ১৫