রিপোর্টারের কথা; হাসপাতালের দিনরাত্রি

saifullah2কেমন আছি আমি? সবার মতো প্রশ্নটা আমারও। কিছুক্ষণ আগে একজন ডাক্তার এসে আমার ব্যান্ডিজ ও প্লাস্টার খুললেন। এরপর আবার স্ট্রেচারে। তারপর ২য় তলায় অর্থোপেডিক্স ডিপার্টমেন্ট। সেখানে সব দেখেশুনে ডাক্তার বললেন, সন্ধ্যায় অপারেশন। এরপর বড় ভাই, বন্ধু জিতু, কামরুল, রাজীবকে আলাদা করে ডাক্তার কি যেন বললেন। স্ট্রেচারে শুয়ে ভাবলেশহীন আমি প্রার্থনা করছিলাম আমার পায়ের আঘাতপ্রাপ্ত আঙুলটি শেষপর্যন্ত থাকবেতো। আমি সহ্য করতে পারবোতো সব যন্ত্রণা।

বিপদ বলে কয়ে আসেনা। আর সড়ক দূর্ঘটনা আকাশ দেখে মেঘ বৃষ্টির মতো অনুমান করার মতো কোন বিষয়ই নয়। এমনই এক আচমকা ঝড়ের কবলে পড়ে আমি এখন শয্যাশায়ী। তবে সেটার ব্যপ্তি কতদিনের তা বলা মুশকিল। সাধারনত রাত ১০টায় বাসায় ফিরি আমি। সেদিন একটু দেরি হয়ে গেল। মনে হয় একটা ঘটনার জন্য আমার সময়টা এভাবেই সাজানো ছিল। সোমবার (৪মে১৫) রাতে বাসায় ফেরার পথে একটি সড়ক দূর্ঘটনায় অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল আমার। বাসায় যাবার পথে টমছমব্রিজ পেড়িয়ে যখন কোটবাড়ির দিকে বাইক মুভ করলাম তখন একটি রিকশার পিছনেই ছিলাম আমি। কিন্তু সামনে থেকে একটি দ্রুতগামি ব্যাটারি চালিত রিকশা আমার সামনের রিকশার মুখোমুখি হল। কিন্তু সে রিকশা সরে গেলে রিকশাটি সম্পূর্ণ উল্টো সাইটে টার্ণ করে আমার মুখোমুখি হল। আমি অপ্রস্তুত হয়ে একপাশে কেটে গেলাম। পুরো শরীরটি রক্ষা হল ঠিক কিন্তু যা দেখলাম তা এখনও বিশ্বাস হচ্ছেনা। আমি দেখলাম আমার বা’পায়ের ৪র্থ আঙ্গুলটি মাটির দিকে ঝুলছে। আমার সারা শরীরটা তখন কাপছিল। রিকশা থেকে নেমে প্যাসেঞ্চার আমাকে ধরলেন। নিচে পায়ের দিকে তাকিয়ে তিনি কেপে উঠলেন। পা থেকে স্যান্ডেলটি খুলে ফেললেন। একটা রিকশায় স্যান্ডেল আর মাথার হ্যালমেট তুলে আমাকে রিকশায় উঠালেন। বললেন, আমাকে বিশ্বাস করুন, আমি বাইক নিয়ে আসছি। সামনেই সেন্ট্রাল হসপিটাল। সেখানেই আমাকে নিয়ে যাওয়া হল প্রথম। আমি সম্পূর্ণ বোধ নিয়ে একুশে টিভির রনি ভাই আর বন্ধু জিতুকে ফোন দিলাম। বাসায় জানাবো কিনা তা ভাবছিলাম। ভয় পাচ্ছিলাম বাসায় বড় ভাই ছাড়া কেউ নেই। আব্বাও কিছুদিন অসুস্থ্য আমার দূর্ঘটনার খবরে হয়তো আরো দূর্ঘটনা হতে পারে সে মনে করে আর জানালাম না।

পথযাত্রীটিই আমার বাইক নিচে রেখে হাসপাতালের দুতলায় আমাকে নিয়ে গেলেন। প্রথমে আমি এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে হাটছি এরপর সেলোক আমাকে পাজাকোলা করে উপরে উঠালেন। মাত্র ১০মিনিটেই চলে গাড়ি নিয়ে চলে এলেন ইটিভির রনি ভাই, রাজীব আর নুরে আলম রনি ভাই। অনেক চিতকার করেও সেখানে ডাক্তার পাওয়া গেল না।

ওরা আমাকে নিয়ে গেল সদর হাসপাতালে। সেখানে রক্তটা বন্ধ করে আবার গাড়িতে। কুমেক হসপিটালে যেতে যেতে গাড়িতে বসে যন্ত্রনা চেপে আম্মাকে কল দিলাম। মুয়াজ রিসিভ করলো। বললাম, চাচ্চু তোমার আপ্পির সাথে ঘুমিয়ে য্ওা আমার ফিরতে দেরি হবে। তোমার ভাইয়া কি করে?

কুমিল্লাে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগের নিচতলায় বন্ধু জিতু, মিঠু ভাই আকাইদ ভাই, জাকির অপেক্ষা করছিল। মনে হচ্ছিল কে যেন সবাইকে জানিয়ে রেখেছে। ওরা প্রাণপন চেষ্টা করছে আমাকে সুস্থ্য করে তোলার। জিতু রাজীব আমাকে পাজাকোলা করে জরুরী বিভাগের অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেল। ডাক্তাররা দ্রুত আমাকে নিয়ে ব্যস্থ হয়ে গেলেন।

ডাক্তারকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম আমার আঙ্গুলটা থাকবেতো। তিনি হেসে বললেন, আমরা চেষ্টা করছি। আপনি শান্ত থাকুন। আল্লাহর ইচ্ছাই সব।

তারপর যন্ত্রনাময় ড্রেসিং আর বাকী সব ওটির কাজকারবার। শুধু এতুটুকু বুঝেছি আমার হাতটা মাথার বা’পাশ থেকে জিতু শক্ত করে চেপে রেখেছে। আর বুকের উপর থেকে জাকির আর মাথার ডান পাশ থেকে রাজিব চেপে ধরে আছে। পরে শুনলাম মিঠু ভাই রক্ত দেখে অসুস্থ বোধ করেন যা অনেকেরই হয়। জিতু তাকে মাথায় পানি দিয়ে স্বাভাবিক করেন।

সব যেন গল্পের মতো মনে হচ্ছিল। রাজীবকে বললাম, আমার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছে। আসলে কি তাই। আকাইদ ভাইতো ঘুমানোর প্যান্ট পড়েই এসে পড়েছেন। তাকে বললাম বিপুল ভাইকে আমার সালাম দিবেন।

দু’তলা থেকে নামার লিফট নষ্ট। তাই আমার ষ্ট্রেচারটি কয়েকজন ধরে নিচতলায নামিয়ে আনলো। মাথার পাশে এসে দাড়ালো সুমন। বললো সে বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। খবরটা পেয়ে চলে এসেছে। সে এসেছে ক্যান্টনমেন্ট থেকে (প্রায় ১৫ কিলোমিটার) সরকারি মেডিকেলে বেহাল দশা আমরা খুব প্রত্যক্ষ করলাম। লিফট বন্ধ তাই স্ট্রেচারটি ঠেলে ঠেলে ৫তলায় নিয়ে আসা হল। কোথাও বেড খালি নেই। আমাকে ভর্তি করা হল। হসপিটালে প্রথম রাত কাটছে রোগী হিসেবে। বেড না থাকায় সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো। কি করা যায় তা নিয়ে সবাই পেরেশান। বারান্দায় শত শত রোগী শুয়ে আছেন। আজ তাদেরই একজন আমি। বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সহজ। কিন্তু এ মুহুর্তে কোথাও ডাক্তার মিলবেনা। তাছাড়া রাত পোহালেই আমি কেবিনে যাব এমনটাই আশ্বাস দেয়া হল আমাকে। আেমাকে শুইয়ে দেয়া হল নতুন একটি বিছানায়। এখানে রোগী ছাড়া সবাইকে বের করে দেয়। নার্সরা সবাইকে যেতে বললেন। তারা থাকতে চাইলেও বিদায় নিতে হল। যেহেতু সকারে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখবেন তাই ওই সময় যেন সবাই থাকতে পারে। রাত আড়াইটা হবে প্রায়। জাকির কতক্ষন মাথায় হাত বুলালো। তারপর সুমন রাজীব এসে পাশে বসলো। বারান্দায় থাকার ব্যবস্থা হলেও উপরে ফ্যান আর পরিস্কার বিছানা দেয় হল। ওরা দুজন আমাকে শান্তনা দিয়ে বললো আপনি ঘুমান সব ঠিক হয়ে যাবে। জাকির চলে গেল। রনি ভাই বড় ভাইয়ের সাথে বারবার ফোন দিয়ে বললেন, আপনি নিশ্চিত থাকেন আমরা সবাই আছি। আসতে হবে না। আসলে আমার বাসা থেকে হসপিটাল অনেক দূর তাছাড়া আমি জানি বড় ভাই বাসা থেকে বের হলে আম্মা আব্বার প্রেসার বেড়ে যাবে। যেন রাতে তারা না আসেন আমি রিক্যোয়েস্ট করি। কৌশলে বলি যে একটু পা কেটে গেছে।

রাতে চোখ বন্ধ করে রেখেছি ঠিক কিন্তু ঘুম হয়নি। এদিক ওদিক শুধু চিতকার, আর্তনাদ, ব্যথার কোকরানো কান্নার শব্দ। পাশে জেগে আছে সোহরাব সুমন আর রাজীব। রাত সাড়ে ৩টায় রনি ভাই আবার ফোন দিয়ে খবর নিলেন।

মাঝে মাঝে হাত ঘড়িটাতে দেখি রাত পোহাবার কত দেরি। ফজর নামাজটা ইশারায় সেরে নিলাম। একটু পর দেখি বড় ভাই আমার শিয়রে। তিনি মনে হয় মানতে পারছেননা ব্যপারটা। প্লাস্টার পা দেখে কি ভাবছিলেন তিনি?

সুমন জানালো বিস্তারিত। রাজীব সুমনের কথোপকথনে সবই বুঝতে পারলেন তিনি। আম্মা আব্বাকে জানানো হল ধীরে ধীরে। আমি তাদের সাথে কথা বললাম। শান্তনা দিলাম ওদের। আমার রাতে ফিরতে দেরি হলে আব্বা প্রায় বকুনি দিতেন। তাই আম্মাকে বললাম, আব্বাকে আজ কিভাবে বুঝাবো। আমি যখন ঢাকায় ছিলাম। আব্বা প্রায়ই বাইকের শব্দ পেলে বলতেন আমি আসছি। কিন্তু না, আমিতো ঢাকায় বাইক নেইনি। বাসা থেকে ঢাকায় ফেরার পর আব্বা আমার কথা ভেবে চোখ মুছতেন। আম্মাকে সাহস দিলাম। আল্লাহর সিদ্ধান্ত এটাই ছিল। আরো বড় কিছুতো হতে পারতো। সব কিছুই আমাদের মেনে নিতে হবে।

সেই ২০০০সাল থেকে বাইক চালাই আমি। দু’একবার বৃষ্টিতে রাস্তায় স্লিপ করা আর গেল বছর একটি বাইক পেছন থেকে আঘাত করা ছাড়া বড় কোন দূর্ঘটনায় আমি পড়িনি। খুব ধিরস্থীর বাইক চালানোর চেষ্টা সবসময়ের। তাই অনেক সিনিয়ররা আমার সাথে বাইকে চড়তে স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন। আমার দূর্ঘটনাটির খবর শুনে শত শত মানুষের দোয়া পেয়েছি। ফেসবুক অনলাইন মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়ায় খবরটি পেয়ে দেশ বিদেশ থেকে অনেক বন্ধু, শুভাকাংখী আপনজন ফোন করে দোয়া করেছেন। আমি আপনাদের এ ভালোবাসায় ঋনি।

খবর পেয়ে গত ২দিনে হসপিটালে ভিড় করেছেন অজস্র মানুষ। কেউ ছোট ভাই, কেউ বড় ভাই। সবাই আপন হয়ে গেলেন আমার। আমি এ মানুষগুলোর কাছে ঋণী। সত্যিই তাদের ভালোবাসা আমাকে সাহস যুগিয়েছে। অনেকেই ফেসবুকে আমার জন্য দোয়া চেয়েছেন তারা আমার রক্ত সম্পর্কে কেউ নন। কিন্তু যে বন্ধুনে আমাকে বে৥ধে নিলেন তা ভুলার নয়।

কথা ছিল ক’দিন পর কক্সবাজার যাবো। জিতু, রনি ভাই, রাজীব আর আমি সেদিন একসাথে সেনাবাহিনীর ফায়ারিং স্কোয়াড ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। দুপুর থেকে মনটা কেমন অস্থির ছিল। জিতু বলছিল তার ক্ষিদে নেই। ভালো লাগছে না। রাতে জিতু মিঠু ভাই, আকাইদ ভাইসহ বসেছিলাম ঈদগাহের মাঠে। চাদনী রাতে ওদের বিদায় দিয়ে আসলাম পরদিন কিছু কাজের পরিকল্পনা করে। কিন্তু আমাদের কি সাধ্য আল্লাহর পরিকল্পনাকে অমান্য করার।

আমার অনেক প্রিয় মানুষ হসপিটালে ছুটে এসেছেন তাদের সবার নাম না বললেও আমি তোমাদের এবং আপনাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ। তোমাদের ভালোবাসাই আমার সাহস এবং এগিয়ে চলার শক্তি। কুমেক কর্তৃপক্ষকে কৃতজ্ঞতা। তারা প্রতিটি মুহুর্তে আমার খোজখবর নিয়েছেন।

হয়তো এ লেখাটি যখন আপনি পড়ছেন ততক্ষণে আমার অপারেশন শেষ। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে পায়ের ওই আঙ্গুলটি থাকবে কি না! ব্যক্তিজীবনে জেনে বুঝে কাউকে আঘাত দিতে শিখিনি। তব্ওু দোষে গুনে পূর্ণ পরিচয় আমি মানুষ। তবুও এটা আমার জন্য একটি পরীক্ষাই মনে করি আমি। সবাই দোয়া করবেন। যারা আমার কোন আচরণে আহত হয়েছেন তাদের কাছে অবশ্যই আমি ক্ষমাপ্রার্থী। বই পড়ে দিন কাটানোর একটা সুযোগ হল এই দু:সময়ে।