স্বপ্নের চুরুলিয়ায় কয়েক ঘন্টা

Asansol- 2হাবিবুর রহমান স্বপন।। সেই শিশুকালে যিনি আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়েছেন। জীবনের শুরুতেই আমরা যাঁর কবিতা আবৃত্তি করেছি ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি, সবার আগে কুসুমবাগে উঠবো আমি জাগি!’ যিনি শুধু আমাদেরই ঘুম থেকে জাগাননি বাঙালিকে তথা সমগ্র ভারতবাসীকে জাগিয়েছেন তিনি জাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

‘কাঠবেড়ালি! কাটবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও ?’ ‘অ মা তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং ?’ ‘বাবুদের তাল-পুকুরে/ ‘হাবুদের ডাল কুকুরে’ ইত্যাদি ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করে আমাদের শিশুকাল শুরু। তার পর বিদ্রোহী কবিতায় আমাদের মনে বিপ্লবের বীজ বপন করে দিয়েছেন মহান সে কবি নজরুল।

আমদের নিঃশ^াসে-প্রশ^াসে কবি নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ। শিশুকাল থেকে যাদের কবিতা পড়ে এবং আবৃত্তি করে আমি বড় হয়েছি, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁদের মধ্যে অন্যতম। প্রিয় কবি সম্পর্কে জানার আগ্রহ বা কৌতুহল সবারই যেমন থাকে আমারও আছে। দুঃখের মাঝে দুখু মিয়ার বেড়ে ওঠার গল্প আমার Ịদয়কে সেই ছোট সময়ই ঝাঁকুনি দিয়েছিল। প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ, লালন ফকির, হাসন রাজা, জসিম উদ্দিন, জীবনানন্দ দাস, সুকান্ত ভট্টাচার্য, বন্দে আলী মিয়া, এবং প্রিয় লেখক শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেকের জন্ম স্থান এবং তাঁদের লীলা ভূমি সমূহ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বহুদিনের লালিত ইচ্ছা নজরুলের জন্ম স্থানটি দেখার। সম্প্রতি আমার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে।

বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে নজরুল যখন জন্ম গ্রহণ করেন (১৮৯৯ খ্রি.) তখন সেটি ছিল অবিভক্ত বাঙলার অংশ। এখন শুধু বাঙলা দ্বিখ-িতই হয়নি ভারত বিভক্তির কারণে চুরুলিয়া যাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু মানুষ বিশেষ করে বহু বাঙালির মনে সাধ প্রিয় কবির জন্ম স্থানটি দেখে আসবেন কিন্তু তা সহজ নয়। কারন চুরুলিয়া ভারতের পশ্চিম বাংলার অন্তর্ভূক্ত। সেখানে যেতে হলে প্রথমে দরকার পাসপোর্ট। এর পর ভিসা। তারপরেও কত ঝক্কি-ঝামেলা।

দূর্গাপুর বর্ধমান জেলার অন্যতম নগরী যেটি ইস্পাত নগরী হিসাবে পরিচিত। দূর্গাপুরের সুরেন্দ্র চন্দ্র (বাংলা মিডিয়াম) মডার্ণ স্কুলের এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে আমি আমন্ত্রিত হয়েছিলাম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে। গুণি শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক চুরুলিয়ার সন্তান নজরুল একাডেমির সাবেক সভাপতি (তিনি তিন মেয়াদ নজরুল একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন), নজরুল গবেষক ড. সুশীল ভট্টাচার্যের আমন্ত্রণেই আমাদের দূর্গাপুর যাওয়া। বাংলাদেশ কবিতা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কবি মাণিক মজুমদারের মাধ্যমেই নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম আমি এবং অন্য তিনজন। মাণিক ছাড়াও আরও ছিলেন টাঙ্গাইল মাওলানা ভাষানী মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ কবি ড. এনামুল করিম শহীদ (তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী নাহিদা সুলতানা পলি), যুগ্ম সচিব কবি আল বেরুনী এবং নাজিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক কবি হরে কৃẲ দুবে। দুদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় আমরা ছিলাম বিশেষ অতিথি বা বক্তা। প্রথম দিনের (২০ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দূর্গাপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দ্বিতীয় দিন (২১ ফেব্রুয়ারি) পশ্চিম বাংলার কৃষিমন্ত্রী পুর্ণেন্দু রায়।

আমরা রওনা হলাম কলকাতার উদ্দেশ্যে ১৯ ফেব্রুয়ারি। আমি বেনাপোল-পেট্টোপোল বর্ডার পথে আর অন্যরা দর্শনা-গেদে বর্ডার হয়ে। কলকাতায় রাত্রি যাপন হলো একই হোটেলে। সকাল সাতটায় আমরা ট্যাক্সিতে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনের টিকিট কেটে উঠে পড়লাম। সকালে কিছু না খেয়েই আমার রওনা দেয়ায় প্রচ- ক্ষুধা পেলো। ক্ষুধার কথা আলোচনা করতেই বর্ধমান স্টেশন থেকে হকার নাস্তা নিয়ে উঠলো। ক’প্যাকেট নাস্তা কিনে নিলাম। দ্রুতগামী ট্রেনটি বর্ধমান হয়ে মাত্র ২ ঘন্টা ১০ মিনিটে দূর্গাপুর স্টেশনে পৌঁছালো।

দূর্গাপুর বিরাট শহর। জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। শহরের অর্ধেক এলাকা জুড়ে স্টিল ফ্যাক্টরি। স্টেশন থেকে আমাদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক হোটেলের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোামিটার। সুরেন চন্দ্র মডর্ণ স্কুলের একটি মাইক্রোবাস আমাদের স্টেশন থেকে নিয়ে গেল হোটেলে। শহরের মধ্যেই হোটেলটি নিরিবিলি এলাকায়। দিনের তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাতে কমে হয় ১৫ ডিগ্রি।

আমরা বিকাল পাঁচটায় সুরেন চন্দ্র মডার্ণ স্কুলের অনুষ্ঠানে যোগ দিলাম। স্কুলের গাড়িতেই পৌর মিলনায়তনে পৌঁছুলাম। স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সম্পাদক শ্রী সুশান্ত পোদ্দারের (স্কুলটির নামকরণ তার বাবার নামে) নেতৃত্বে ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানালো। শিশু-কিশোর এবং তাদের অভিভাবকদের পদভারে মিলানায়তন চত্বর মুখরিত। বিশাল মিলানায়তনের সবগুলো আসন পূর্ণ। অনেক দর্শক শ্রোতা দাঁড়িয়ে। স্কুলের ছোট ছোট শিশুরা যখন অনুষ্ঠানের সূচনা করলো তখনই আমরা মন-প্রাণ ভরে গেলো। কারণ একেবারেই ৪-৫ বছরের শিশু, ওরা বাজনার তালে তালে মূকাভিনয় করে গানের তালে নাচলো। এক কথায় বলা যায় অসাধারণ। এর পর ক্রমান্বয়ে ¯ু‹লের অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীরা নাচ-গান এবং অভিনয় করলো। উল্লোখ্য, স্কুলটির শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২০০। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারও গান পরিবেশন করলেন। স্কুল প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে মাতৃভাষা দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠান হলো।

দূর্গাপুরের সাবেক মেয়র এবং ভারপ্রাপ্ত মেয়রসহ আমরা বাংলাদেশের অতিথিরা বক্তৃতা দিলাম। প্রিন্সিপ্যাল এনামুল করিম ভাষা আন্দোলনের উপর আবেগঘণ বক্তৃতা দিলেন। দর্শক-শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শ্রবণ করছিলেন। আমাদের অন্যদের বক্তৃতার সময়ও মূহুর্মূহু করতালিতে মিলনায়তন মুখোরিত হয়ে ওঠে। কৃষিমন্ত্রী পূর্ণেন্দু রায় ভাষা আন্দেলনে ঢাকায় ছাত্র আন্দোলন এবং বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করলেন। এর পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে যখন সমবেত কণ্ঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি…’ গানটি গাওয়া হচ্ছিল তখন আমরা সামনে দর্শক সারিতে বসা বাংলাদেশের কয়েকজন অতিথি উঠে দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের জাতীয় সঙ্গীতকে সম্মান জানালাম। কৃষিমন্ত্রী পূর্ণেন্দু রায় গানটি শেষ হওয়ার পর উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের সকলকে অভিনন্দন জানালেন। রাত দশটা পর্যন্ত চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি। সুশীল ভট্টাচার্য এবং স্থানীয় পত্রিকা ‘কামধেনু’র সম্পাদক শ্রী ধনηয় ভট্টাচার্য আমদের মাইক্রোবাসে হোটেল থেকে তুলে নিয়ে রওনা হলেন আমার স্বপ্নের চুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে। প্রশস্ত সুন্দর সড়ক। মাঝারি গতিতে চলছে গাড়ি। দূরত্ব ৭৮ কিলোমিটার। সড়কের উভয় পাশের্^র জমিতে এবং ছড়ানো ছিটানো বাড়ির আঙ্গিনায় জরো করা আছে কয়লা। সাইকেলে বস্তায় ভরে কয়লা নিতে দেখলাম বহু মানুষকে। অনেকে আবার ভ্যান এবং ছোট ছোট জীপের ছাদে বস্তায় ভরে কয়লা নিচ্ছে। সুশীল বাবু বললেন অত্র এলাকার প্রায় দেড়’শ বর্গ কিেেলামিটার জুড়ে কয়লা আর কয়লা। মাটি খুড়লেই কয়লা। এসব কয়লা বিক্রি করে দরীদ্র জনগোষ্ঠী অর্থ উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করে। গাছ-পালা কম। লাল মাটি। আমার আর তড় সইচে না। কখন পৌছুবে আমাদের যানটি প্রিয় কবির জন্মভূমিতে। এক ঘন্টা ১০ মিনিট লাগলো চুরুলিয়ায় পৌঁছুতে। ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ৮ টায় আমরা কবির জন্ম ভিটায় উপস্থিত হলাম।

কাজী নজরুল ইসলামের বাড়িটি এখন নজরুল একাডেমি। বিশাল তিন তলা ভবন। পশ্চিম বাংলা সরকার এটি নির্মাণ করেছে। ভবনটির নামকরণ করা হয়েছে কবির প্রিয় বন্ধুর নামে কমরেড ‘মোজাফ্ফর আহমেদ স্মৃতি ভবন’।

আমাদের স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন কবির ছোট চাচার ছেলে কাজী মাজাহার হোসেন। কবির ছোট চাচা কাজী আলী হোসেনকে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুন তৎকালীন সময়ের পেটি জমিদারের গুন্ডারা হত্যা করেছিল। তার অপরাধ ছিল তিনি পেটি জমিদারের অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছিলেন। কাজী মাজাহার হোসেন আমাদের প্রিয় কবির বাড়ি এবং তার স্মৃতিময় স্থান সমূহ ঘুরে ঘুরে দেখালেন। দেখালেন যে মক্তবে কবি পড়েছেন। সেটি এখন নজরুল একাডেমি। বাড়ির সামনেই হাই স্কুলটির বিশাল ইমারত। সামনে খেলার মাঠ। ওই মাঠের উত্তর প্রান্তেই কবির পারিবারিক কবরস্থান। যেখানে কবির পিতা কাজী ফকির আহমদ, মা জাহিদা খাতুন ও কবির সন্তান এবং স্ত্রী প্রমিলা দেবীর সমাধী। পশ্চিম দিকে কবির সমাধী (ঢাকার কবর থেকে মাটি নিয়ে সেখানে কবর দেয়া হয়েছে)। নির্মান করা হয়েছে কবির প্রতিকৃতি। পাথরে তৈরি কবির দ-ায়মাণ প্রতিকৃতি বা মূর্তি। কবরস্থানের ৩০ গজ পূর্ব দিকে মসজিদ। নজরুল যে মসজিদে আজান দিতেন এবং মাঝে-মধ্যে ইমামতি করতেন। মসজিদ সংলগ্ন একটি মাযার। কবির পিতা উক্ত মাযারের খাদেম ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর নজরুল খাদেমের দায়িত্ব পালন করেন। মসজিদের পুরাতন অংশ এখনো দ-ায়মান। নতুন করে নির্মান করা হয়েছে। মসজিদটি এখন আর ছোট নেই। এখন সেটি বড় মসজিদ। সকাল নয়টা তখন, বেশ কয়েকজন মুসল্লিকে দেখলাম তারা ধর্মীয় গ্রন্থাদী পড়ছেন। কবি ত্রিশাল থেকে চলে যেয়ে ভর্তি হয়েছিলেন রানীনগর শিয়ারশোল রাজ উচ্চ বিদ্যালয়ে। দশম শ্রেণী পর্যন্ত কবি উক্ত স্কুলে পড়েন। বিদ্যালয়টির দূরত্ব চুরুলিয়া থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার। সময়াভাবে সেটি দেখা হলো না। বেশ ক’বছর বিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ড. সুশীল ভট্টাচার্য।

সুশীল বাবু জানালেন কিশোর বয়সে প্রতিবেশী এক মেয়ের সঙ্গে কবির ভাব হয়। বিয়েও করতে চেয়েছিলেন। নজরুলের মা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলে মেয়ের বাবা তার সাথে খারাপ আচরণ করেন। অর্থাৎ মেয়ের অবিভাবক নজরুলের সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজী হননি। আরও জানালেন, নজরুল বাঙালি পল্টন থেকে সৈনিকের চাকুরি ছেড়ে একবার মাত্র চুরুলিয়ায় এসেছিলেন।

কবির বাড়ি ছিল খড়ের ঘর। যার নমুনা এখনো রয়ে গেছে তাঁর ছোট চাচা আলী হোসেনের বাড়িতে। প্রায় ৪০ফুট দৈর্ঘ্যের একটি খড়ের ঘর বাড়ির প্রবেশ পথে। তবে দেয়াল ইটের। সামনে বড় ইঁদারা। কাজী পরিবারের বাড়ির এলাকা প্রায় তিন একর এলাকা জুড়ে। সেখানেই কবির আত্মীয় স্বজনরা এখন বসবাস করেন। নজরুল ইসলামের পৈতৃক বাড়িটিতে ভারত সরকার বিরাট তিন তলা ইমারত নির্মান করে দিয়েছে। এর নিচ তলায় লাইব্রেরি, অফিস কক্ষ, সম্মেলন কক্ষ এবং জাদুঘর। জাদুঘরের কবির লেখা পান্ডুলিপি, তাঁর ব্যবỊত কলম, জামা-কাপড় ইত্যাদি রয়েছে। দ্বিতীয় তলায় একাডেমির পাঠ কক্ষ এবং সঙ্গীত চর্চার জন্য কক্ষ এবং তৃতীয় তলায় আবাসিক কক্ষ। অতিথিদের থাকার জন্য কক্ষ রয়েছে কয়েকটি। বহু গবেষক এবং পর্যটক আসেন যারা এখানে রাত্রি যাপন করতে পারেন।

চুরুলিয়ার পথে যা দেখলাম তা দেখে অবাক হলাম। এই বাংলার মতো ওই এলাকাটি তেমন সবুজ না। বৃক্ষরাজি কম। জনবসতিও কম। পানির সংকট। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা ব্যয় বহুল। যেখানে পানি পাওয়া যায় সেখানেই বসতি। ফসল বৃষ্টি নির্ভর। বর্ষাকালে একটি ফসল হয়। শীতকালে মাঠে ফসল নেই। রুক্ষ প্রকৃতি। চুরুলিয়ার কাছাকাছি ঝাড়খন্ড রাজ্য এবং রাঢ় এলাকা হিসেবে পরিচিত বীরভূম জেলা।

কবির চাচাতো ভাই মাজাহার হোসেন আমাদের আপ্যায়ন করলেন মিষ্টান্ন, লুচি, সব্জী এবং ফল দিয়ে। প্রায় সত্তর বছর বয়স্ক মাজাহার হোসেন বেশ প্রাণবন্ত। চেহারায় নজরুলের সাথে বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গ্রামটিতে পূর্ব-পশ্চিম এবং উত্তর-দক্ষিণ দুটি সড়ক পাকা। ফসলী জমি এবং বসত বাড়ি সমান্তরাল ভূমিতে। বন্যা হয় না এই এলাকায়। ড. সুশীল ভট্টাচার্য নজরুল গবেষক। তিনি আমাদের যাত্রা পথে গাড়ির মধ্যে সব জনপদ দেখালেন এবং বললেন এসব এলাকায় কাজী নজরুল ইসলাম বাসুদেবের কবিদলে তাঁর চাচার সঙ্গে লেটো গান গেয়ে বেড়াতেন। যাত্রাপালা দেখার জন্য বন্ধুদের সঙ্গে ৮/১০ মাইল হেটে চলে যেতেন কবি। চুরুলিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা তখন ছিল ট্রেন নির্ভর। এখন ট্রেন চলে না।

আমরা কবির চারণ ভূমি দেখলাম। আর মনে মনে ভাবলাম এই গাছটির নিচে হয়তো কবি বসে বিশ্রাম নিয়েছিলেন বা বাঁশি বাজিয়েছেন। অথবা এই পথে দৃপ্ত পায়ে কবি হেটেছেন। প্রায় তিন ঘন্টা চুরুলিয়ায় অবস্থানের পর আমরা রওনা হলাম বনগ্রামের উদ্দেশ্যে। চুরুলিয়া থেকে ১৫ কি.মি দূরে বনগ্রাম। এসব এলাকাতেও কবি লেটো গানে গেয়েছেন। বনগ্রামের Ļক্য সাহিত্য পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আয়োজিত মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগদানের করলাম। ক’মিনিট ভাষা দিবসের উপর বক্তব্য করতে হলো। স্কুল মাঠে বিরাট প্যান্ডেল। আয়োজকরা জানালেন, এখানে নজরুল লোটো গান গেয়েছেন।

কবির জন্মভূমি দেখার যে স্বপ্ন দীর্ঘ কয়েক যুগ লালন করে আসছিলাম তা পূরণ হলো। আর এর কৃতিত্ব কবি মাণিক মজুমদারকেই দিতে হয়। কারণ তার মাধ্যমেই শিক্ষাবিদ ড.সুশীল ভট্টাচার্যের সঙ্গে আমার পরিচয়। সুশীল বাবুর মতো প্রাণ খোলা আন্তরিক লোক আমি কমই দেখেছি। তার দীর্ঘায়ূ কামনা করি।

নজরুলের স্মৃতিধন্য ত্রিশাল এবং কুমিল্লা দেখার পর এবার চুরুলিয়া ঘুরে এসে আমার মনে বারবারই একটি কথার উদ্রেক হচ্ছে, ‘জীবনের আর একটি সাধ সৃষ্টিকর্তা পূরণ করলেন’।