থানা পুলিশের আয় নিয়ে কিছু কথা……

thana policeহাবিবুর রহমান স্বপন।। থানা পুলিশের আয় কত? দিনে এবং মাসে কত টাকা আয় পুলিশের? প্রশ্ন করতেই পারেন যে কোন ব্যাক্তি। এটা আবার কেমন প্রশ্ন। শুনতে অবাক লাগলেও সত্য এটা পুলিশের আয়!

পাবনা জেলার দশম থানা আতাইকুলা। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে আতাইকুলা থানার স্বীকৃতি দেয়। বহুকালের দাবি ছিল পাবনার অন্যতম ব্যবসা কেন্দ্র আতাইকুলা থানা স্থাপনের। সাঁথিয়া থানার আর-আতাইকুলা ও ভুলবাড়িয়া ইউনিয়ন, পাবনা সদর উপজেলার আতাইকুলা ও সাদুল্লাপুর এবং আটঘড়িয়ার লক্ষèীপুর ইউনিয়ন নিয়ে আতাইকুলা থানা গঠিত হয়।

থানা প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরম পন্থিদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে আতাইকুলা পুলিশকে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীদের উৎপাত।

পাবনা থেকে ঢাকা মহাসড়কের যাত্রীদের ভোগান্তির শিকার হতে হয় আতাইকুলায়। সেটা হাটবারে বেশি হয়। দেশের অন্যতম বৃহৎ কাপড়ের হাট আতাইকুলা। তাঁতীরা তাদের উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি, বেড শিট, গামছা ইত্যাদি বিক্রি করে এই হাটে। মহাসড়কের উপর বসে পাটের হাট। যানবাহন : নসিমন, করিমন, ভটভটি, ভ্যান ইত্যাদিতে সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। দূরপাল্লার বাস, রোগীবাহী আ্যম্বুলেন্স, ফায়ার ব্রিগেড-এর গাড়ি কোন কিছুই অগ্রসর হতে পারে না। অথচ আগে যখন আতাইকুলায় থানা ছিল না, পুলিশ আসতো সাঁথিয়া থেকে তখন মহাসড়কটিতে অতটা যানজট হতো না। এখন থানা-পুলিশ অতি নিকটে তার পরেও সড়কে যানজট। এই জট কেন? কি কারণে? পুলিশের ভূমিকা কি? এসব অনুসন্ধান করতে যেয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিললো।

নানা শ্রেণী পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল অনেক তথ্য। নসিমন, করিমন, ভটভটি প্রতি পুলিশ টাকা নিয়ে থাকে। প্রতি মাসে এই খাতে আতাইকুলা থানা পুলিশের আয় প্রায় ১০ লাখ টাকা। লেগুণা, বেবি ট্যাক্সি, মাইক্রোবাস এবং পণ্য বোঝাই ট্রাক থেকে আয় হয় আরও প্রায় ২০ লাখ টাকা। প্রতিটি নসিমন, করিমন এবং ভটভটি থেকে মাসে টাকা নেয়া হয় এক’শ থেকে দুই’শ টাকা হারে। বেবি ট্যাক্সি ওযালাদের গুণতে হয় মাসে দেড়’শ টাকা। পণ্য বোঝাই ট্রাক আতাইকুলা হয়ে যাতায়াত করলেই পণ্যের মাণ অনুযায়ী দিতে হয় টাকা। এর পরিমান দুই’শ থেকে পাঁচ’শ টাকা পর্যন্ত।

কথা হচ্ছিল লেগুণা চালক আব্দুল হাইয়ের সাথে। তার ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। আতাইকুলা থানা পুলিশকে সে নিয়মিত টাকা দেয়। গত ১৪ মাস সে কাশিনাথপুর থেকে পাবনা পথে লেগুনা চালায়। কেউ তাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকার জন্য কৈফিয়ত তলব করেনি বা তার জেল জরিমানাও হয়নি। একই ভাষ্য ড্রাইভার বাবু’র। পাবনা থেকে মাধপুর যাচ্ছিলাম। পাবনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে পূর্ব দিকে কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে পেলাম লেগুনা। আতাইকুলা বাজারে পৌঁছুতেই নাদুস-নুদুস চেহারার এক যুবক এসে দাঁড়ালো গাড়ির কাছে। তার হাতে লেগুনার হেলপার আব্দুর রশিদ গুজে দিল ২০ টাকা। ড্রাইভার আবুল কালাম জানালো প্রতিমাসে পুলিশ বাবদ ওরা নেয় ২’শ টাকা। প্রতিদিন সড়কে গাড়ির চাকা ঘুরলেই এখানে (আতাইকুলা) দিতে হয় ২০ টাকা। অন্যথায় গাড়ির চাবি কেড়ে নেয় পুলিশের নিয়োগ করা মাস্তানরা। আবার কখনো কখনো পুলিশ গাড়ি নিয়ে আতাইকুলা থানার মধ্যে আটকে রেখে দেয়। তখন হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ছাড় করাতে হয়। ঝামেলা এড়াতে আমরা প্রতিদিন ২০ টাকা দিয়ে সড়কে গাড়ি নামাই।

গত সপ্তাহে সাঁথিয়া থেকে বেবি ট্যাক্সি যোগে ফিরছিলাম পাবনায়। মাধপুর এবং আতাইকুলার মধ্যবর্তী স্থানে পুলিশ গাড়ির গতি রোধ করলো। ড্রাইভারকে পুলিশের এক সেপাই জিজ্ঞাসা করলেন ‘কিরে এ মাসের টাকা দিয়েছিস তো?’ ড্রাইভার যুবক উত্তর হ্যাঁ সূচক দিয়ে একটা টোকেন দেখালো। আমি সেটি তার কাছে দেখতে চাইলাম। সে দেখালো। একটি ছোট কাগজে হাঁস এর ছবি সম্বলিত সীল মেরে দেয়া হয়েছে। তাতে স্বাক্ষর আছে কফিল নামে কোন এক ব্যক্তির। ড্রাইভার আব্দুল বাতেন বললেন স্যার প্রতি মাসে আমাদের পুলিশকে এবং সড়ক পথের মাস্তানদের চাঁদা দিতে হয়। যাত্রী নিয়ে পাবনা শহরে প্রবেশের পথে পুলিশের নিয়োগকৃত মাস্তানরা ৪০ টাকা নেয়। টাকা দিতে অস্বীকার করলে জনি, রানা, রকি নামের মাস্তানরা আমাদের মারপিট করে এবং গাড়ির চাবি কেড়ে নেয়। গতমাসে একজনের গাড়ির গ্লাস ভেঙে দিয়েছে ওইসব মাস্তান। গত শনিবার আমি ফিরছিলাম বেবি ট্যাক্সিতে। সত্যিই পাবনা শহরের প্রবেশ পথে বাস টার্মিনালের কাছে বটতলায় এক হ্যাংলা-পাতলা যুবক সান গ্লাস চোখে এসে দাঁড়ালো বেবী ট্যাক্সির সামনে। ড্রাইভার ওর হাতে তুলে দিল দুটি ২০ টাকা নোট (৪০ টাকা)। আমি ওই যুবককে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম এই টাকা কি জন্যে নিলে? এটা কি টার্মিনাল ফি? ও আমার কথায় কোন উত্তর না দিয়ে ড্রাইভারকে ইশারা করলো চলে যেতে। ড্রাইভার আমাকে বললেন, ‘এখানে ওদের টাকা না দিলে থাপ্পর অথবা লাথি খাওয়া লাগে।’

আতাইকুলা বাজারে হাটবারে ট্রাফিক পুলিশ থাকার কথা বলা হয় বিভিন্ন সময় জেলা আইন-শৃংখলা কমিটির সভায়। তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। পাটের হাট বসে মহাসড়কের উপর। সেটি নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন একজন জনপ্রতিনিধি। তার অবাধ ক্ষমতা। পুলিশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও নাকি সেই ইউপি চেয়ারম্যানের। সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে তিনি জনগণকে জিম্মি করে আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। এলাকার সাধারণ মানুষ এবং যানবাহনের চালকরা তার উপর বেজায় বিরক্ত। কিন্তু কিছু করার নেই। কারণ তিনি নাকি পুলিশ নিয়ন্ত্রক। থানায় তার যাতায়াত নিয়মিত।

একজন ট্রাক ড্রাইভার বললেন, গবাদিপশু বোঝাই ট্রাক এবং পাটের ট্রাকের জন্য আতাইকুলা থানা পুলিশকে দিতে হয় দুই’শ টাকা। ট্রাকে কাপড়-এর গাইট উঠালে পুলিশের জন্য বরাদ্দ রাখতে হয় পাঁচ’শ টাকা। খাদ্যপণ্য যেমন চাল-ডাল-গম, পেঁয়াজ-রসুন ইত্যাদির জন্য ট্রাক প্রতি গুণতে হয় কমপক্ষে পাঁচ’শ টাকা। মাঝে মধ্যেই পণ্য বোঝাই ট্রাক তল্লাশী করার কথা বলে হয়রানি করা হয় ট্রাক চালকদের। কায়দা করে ট্রাক থেকে হাজার টাকাও আদায় করা হয়। স্কুল শিক্ষক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বললেন, ‘পুলিশের কার্যকলাপ দেখে আমরা বিরক্ত। আতাইকুলায় থানা হলো, মনে করলাম ভাল কিছু হবে। না এখন আমাদের সন্তনেরা প্রতিদিন স্কুল-কলেজে যাওয়ার পথে দেখছে কিভাবে পুলিশ অবৈধ পন্থায় যানবাহন থেকে টাকা আদায় করে।’

ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক জানালেন, ‘পুলিশের বিরুদ্ধে কথা বললেই মিথ্যা মামলায় আসামী করে দিবে। এমনকি ওরা চরমপন্থীদের তালিকায় নামটা লিখে দিবে।’ ভয়াবহ চিত্র! সত্যিই কি তাই? অনুসন্ধান করা জরুরী। সেই অনুসন্ধান কাজটি করবে কে? সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা করলে তো ভালই হয়।

habibur rahman swaponএই লেখাটি যখন লিখছি তখনই সংবাদপত্রে পুলিশের একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা বেনজির আহমেদের বক্তব্য পড়লাম। তিনি বলেছেন ‘পুলিশ কন্ট্রাক্ট কিলিং বা চুক্তিভিত্তিক হত্যা করে না।’ তার কথায় একটি বাক্য বোধ করি উহ্য থেকে যায় আর তা হচ্ছে ‘অন্য কোন বাহিনী কন্ট্রাক্ট কিলিং করে থাকে।’ এখন প্রশ্ন হচ্ছে পুলিশের বিরুদ্ধে যানবাহনে চাঁদাবাজি সম্পর্কে পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য কি? তারা স্বীকার করেন কি না যে যানবাহনে চাঁদাবাজি হয়। উচ্চ আদালত রায় দেয়ার পরেও কিভাবে মহাসড়কে অবৈধ নসিমন, করিমন, ভটভটি চলাচল করে? এসব যানবাহনে পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি এখন যাত্রী নেয়া হয়। সড়ক-মহাসড়কে যে দুর্ঘটনা ঘটে এর জন্য বহুলাংশেই দায়ী এসব অবৈধ যানবাহন। একজন স্কুল শিক্ষক (সুশীল দাস) যিনি এই নসিমনের কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন তিনি বললেন, নসিমনের চালক দ্রুত গতিতে চালায় তার যানবাহন। এতে আমাদের মাইক্রোবাসটি সাইডে সামান্য জায়গায় সাইড দিতে না পারায় উল্টে যায়। এভাবে কত যে দুর্ঘটনা ঘটে তার হিসাব নেই। তবে একথা সবাই স্বীকার করেন যে অবৈধ এসব যানবাহনই দুর্ঘটনার একটি অন্যতম কারণ। কিন্তু এগুলো বন্ধ করবে কে? এগুলো না চললে মাসে কি করে মোটা টাকা আয় হবে পুলিশের!

আমি একটি থানার আয়ের হিসাব দিলাম। সেটিও পুরোপুরি তথ্য নির্ভর নয়। কারণ আতাইকুলা থানা পুলিশ এভাবে টাকা আয় করে। যা ওপেন সিক্রেট। তবে মাসে কত টাকা আয় হয় তার সঠিক হিসাব বা পরিসংখ্যান দিতে হলে আরও সময় নিয়ে অনুসন্ধান করতে হবে। একই কায়দায় পুলিশ পাবনা জেলার প্রতিটি থানা পুলিশ আয় করে থাকে।

প্রতিটি থানায় একজন মুন্সি আছে। এটি অলিখিত বা আনঅফিসিয়াল পদ। একজন কনস্টবল এই মুন্সির কাজটি করেন। তার দায়িত্ব,বিভিন্ন খাত থেকে টাকা আদায়কৃত অর্থের হিসাব রাখা। এই টাকা ভাগ হয় জেলা পর্যায়ের কর্তা ব্যক্তি থেকে সিপাই পর্যন্ত। পদমর্যাদা অনুসারে টাকা ভাগ হয়। আতাইকুলা থানার মুন্সির দায়িত্বেও আছেন একজন সিনিয়র কনস্টবল।

পাবনা জেলার সবচেয়ে অপরাধ প্রবণ থানা হিসাবে আতাইকুলা চিহ্নিত হয়েছে। সর্বাধিক খুন সংঘটিত হয়েছে আতাইকুলায়। নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থীদের দ্বারা গত পাঁচ বছরে শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গত দুই বছরে দীর্ঘ সময় এই থানাধীন পাবনা-ঢাকা মহাসড়কে গাছ কেটে অবরোধ সৃষ্টি করে রাখে জামায়াত-শিবিরের নেতা-সমর্থকরা।

পাবনা জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি এবং জেলা আইন-শৃংখলা কমিটির সভায় আতাইকুলা হাট এবং বেড়া বাস স্ট্যা- হাটে যানজট নিয়ে প্রতি মাসেই কথা হয়। কিন্তু মহাসড়কের উপর হাট চলছেই। পুলিশ সুপার প্রতি মাসেই আশ্বাস দেন বিষয়টি দেখা হবে-হচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। একই অবস্থা কাশিনাথপুর এবং চিনাখড়া হাটে। পরিস্থিতি দেখে মনে হয় পুলিশ বাহিনীর জেলা প্রধান এই বিষয়টিকে তেমন গুরুত্বই দেন না। জনগণের কল্যানে পুলিশ কাজ করবে সেটাই তো হওয়ার কথা। কিন্তু তা তো আমরা দেখি না। যত্র-তত্র যানবাহন পার্কিং হয়। পুলিশ নির্বিকার।

রক্ষক যখন ভক্ষক হয় তখন সে দেশে আর আইনের শাসন থাকে না। পরিস্থিতি যেন সেই পর্যায়ে না যায় সেটি লক্ষ্য রাখতে হবে। অন্যথায় আইনের শাসন ব্যহত হবে। পুলিশের প্রতি যেন জনগণ আস্থা না হারায় সেটি দেখা জরুরী। যে সব পুলিশ অফিসার বছরের পর বছর ধরে একই জেলায় চাকুরি করছেন তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গত প্রায় ১৫ বছর ধরে একজন পুলিশ অফিসার পাবনার তিনটি থানায় ঘুরে ফিরে চাকুরি করছেন। এ প্রসঙ্গে পুলিশেরই একজন অফিসার বললেন খুঁটির জোর শক্তিশালী হলে ঘন ঘন বদলী হতে হয় না। কে দেখবে এসব অনিয়ম। আইনের মধ্যে বেআইনীর বসবাস! এটা হতে পারে না। আমরা পুলিশের কাজে-কর্মে স্বচ্ছতা আশা করি।

হাবিবুর রহমান স্বপন

(লেখক; সাংবাদিক,কলামিস্ট)